Monday, August 30, 2021

সোনালী চক্রবর্তীর কাব্যগ্রন্হ "মমিস্রোতে...." আলোচনা করেছেন সজ্বল দত্ত

 

'মমিস্রোতে'... তোর বেহায়াজন্ম সার্থক হলো রে, আর লিখিস, নাই ই বা লিখিস।
পাঠ প্রতিক্রিয়া দিলেন পরম শ্রদ্ধেয় কবি Sajjal Dutta
🙏🏻
"" সারসের নগ্নতা থেকে " / সজ্জ্বল দত্ত
..............................................................
" ....... কেবল , অঙ্গে মাধব এলে , / এস্রাজেরও দাঁত গজায়, / তখন ... / নীল , নীল , কী যে দহন , / যাযাবর-জলে , / ছিটকে আসা রক্তের নৌকাবদল খেলি । / এইসব ডালিম যখন শানায় , / ভেবো না , সবই মনে রাখি । / শুধু আমার প্রেতকে যে ক্রুশে লটকে চেরে , / দহে কালাচ দেখব বলে , / কিছু ভাঁজে , মরহুম সে-হন্তার কাছি ফেলে রাখি " ।
" ভাদ্রমেঘে দেখেছি পেখমরাত জুড়ে তুলো-তুলো সন্ত্রাসবাদ । মনে পড়েছে লাটাই কিনতে পারিনি । ফলত যতবার ভালোবেসেছি , ঘরগুলো ভো-কাট্টা হয়ে গেঁথে গেছে চাঁদে । ত্রিভূজে ইঙ্গিত রেখে থাকো প্রায়শই । যেদিন অকারণ লজ্জা আঙুল ছেড়ে গেল , জানা হল পুরোনো হয়েছে আশনাই । মাঝে মাঝে জিদ এলে স্থবির হয়ে যাই , ভয় লাগে খুব । যেহেতু জানি এই লক্ষণ মোক্ষের প্রমাণ দিলে কাছিমের মাংস খুঁজতে হত না চোরবাজারে । দাহ্য তো অপরাধী আজীবনের , কেউ বলে না জিভ শুধু আগুনেরই থাকে " ।
নারীর শতসহস্র বছরের সাজানগোছান লজ্জা ! লজ্জা চামড়া শরীরের , লজ্জা পাপড়ি হৃদয়ের ! .... এই লেখা লিখতে বসে মনে পড়ছে আশির দশকে কলকাতার নিউ এম্পায়ারে একটি ইংরেজী ছবি দেখেছিলাম । " The Towering Inferno " । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো শহরে ১৩৮ তলা উঁচু একটি অত্যন্ত আধুনিক কেতায় নির্মিত বাড়ির সবচেয়ে ওপরের তলাগুলিতে হঠাৎ দাউদাউ আগুন লেগে গ্যাছে , উদ্দাম অগ্নিপতাকা পতপত করে উড়ছে অতি স্বাভাবিকের সাজান কৃত্রিম নির্মাণে । সেখানে আটক ভোগবিলাসে গা ভাসিয়েদের ভয়ার্ত ছোটাছুটি , তাদের উদ্ধার করে নিরাপদস্থানে নিয়ে যাওয়া - অসাধারণ এই ছায়াছবিটির এই ছিল মোটামুটি মর্মবস্তু ।
তরুণ কবি সোনালী চক্রবর্তীর কাব্যগ্রন্থ " মমিস্রোতে বেহায়াসিন্থ " পড়তে পড়তে বারবার স্মৃতিপটে তুলনায় ভেসে আসছে অগ্নিময় এই ছবির বিভিন্ন দৃশ্য । " The Towering Inferno " ছবিটিতে প্রথম আগুন লাগার আঁচ পাওয়া যায় বিল্ডিংয়ের ৮১ তলায় ছোট্ট ইলেকট্রিক্যাল শর্টসার্কিটের সামান্য কয়েকটি স্পার্কে । অতঃপর অতি অল্পসময়ে সেই ফুলকি গোটা বিল্ডিং গ্রাস করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়ার দিকে এগোতে শুরু করে ।
এই লেখার সূচনায় উদ্ধৃত করা বইয়ের প্রথম এবং দ্বিতীয় কবিতার অংশদুটি সম্ভবতঃ প্রথমের সেই ছোট্ট আগুনের ফুলকি , যা একাধারে বাড়তে বাড়তে পুড়িয়ে ছাই করে ফুঁ দিয়ে অনায়াসে উড়িয়ে দেয় সাজান সত্ত্বা সাজান লজ্জা অন্যের আগ্রাসী লোলুপ চাহিদার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এতদিনের কৃত্রিম জন্মগল্পের সমস্ত আড়ষ্টতা , অন্যদিকে হৃদয়ের সবটুকু কোমলতা দিয়ে পরম দায়িত্বে শুরু হয়ে যায় মমতাময় উদ্ধারকার্য্য । -- " অথচ বিষাদনামায় দাসখত লিখেও / কেউ বুঝল না আজও , / কোন যাতনায় তার শরীরে রোহিনীর সওগাত রাইয়েরই নীলাম্বরী " ।
একের পর এক পাতা উল্টে চলেছি । নিবিড় পাঠমুগ্ধতায় অনুভব করে চলেছি ' লৌকিক রমণ ' থেকে ' রাজকীয় সন্ন্যাস ' , ' রাজকীয় সন্ন্যাস ' থেকে ' সিজোফ্রেনিক মস্তিষ্কে আঁকা কার্ফু রাতের হাড়কাটা গলি ' , হাড়কাটা গলি থেকে ' পঞ্চভূতের ধর্ষণ ' , ' জন্মের পর জন্ম ... রাষ্ট্র রেল রুটি রক্ত এসব ইকেবানা সাজাতে সাজাতে হেরে যাওয়া ' --- কোথায় ঠিক কতখানি পেট্রল ছুঁইয়ে কতগুলো দেশলাই কাঠি খরচ করলে শব্দ-অক্ষর এমন তুমুল অগ্নিনান্দনিক রূপ নিতে পারে ? ... " তুমুল অগ্নিনান্দনিক " শব্দবন্ধটি ব্যবহার করব কি করব না দোনামনায় ভাসতে ভাসতে ব্যবহার করেই ফেললাম । সাধারণ জ্ঞানে বুদ্ধিতে ভাবনায় ' অগ্নি ' বিষয়টি নান্দনিক হয়ে ওঠে প্রদীপের সলতেমুখে , তিরতির করে কাঁপতে থাকা মোমবাতির শিখায় । কবি সোনালী চক্রবর্তীর মমিস্রোতে বেহায়াসিন্থে কবিমন উৎসারিত শব্দ ও তার প্রয়োগ অভিনব কায়দায় অনায়াসে কাব্যনান্দনিক করে তোলে সমগ্র চরাচর জুড়ে বিস্তৃত আগুনের উদ্দাম শিখাকে , যা নেভানোর ব্যর্থ চেষ্টায় হয়ত বাস্তবে দমকলের ছ'টি ইঞ্জিনকে অবিরাম জলবর্ষণ করে যেতে হত ।
একটা অদৃশ্য প্রবাহ । ধরা যাক কোনো ব্যক্তিমানুষের মনরূপী সত্ত্বার এক বিশেষ বিন্দু থেকে ভাষায় অক্ষরে জড়ানো' আগুনপ্রবাহ অবচেতনে বইতে শুরু করল । সমস্ত শরীর ... রক্তকণিকা ... মাংসপিণ্ড ... অণুপরমাণু ... সাজান গুপ্তধন ... বাসনাখিদে ... চেতনা চৈতন্য ছুঁয়ে শরীর টপকে সে প্রবাহ এল প্রকৃতিমায়ায় । জড়িয়ে নিল আশপাশের অন্যান্য শরীর , দাঁত নখ ছদ্মবেশ কামদৃষ্টি । ছড়িয়ে যেতে লাগল দেশ কাল রাষ্ট্র জগৎসংসারের নিষ্ঠুর স্বার্থযাপনে । প্রবাহের তুমুল উষ্ণতায় পুড়তে শুরু করল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা , শৃঙ্খলা । গ্রহঘূর্ণণ থমকে দাঁড়াল , আকূল প্রার্থনায় সর্বশক্তিমান সূর্যের সামনে নত হল যেন , সমস্ত হতাশা জড়িয়ে রেখেই চাইল প্রেমিক , পরম প্রেমিক , ভালোবাসার আদিপুরুষ । ... " ঝিম অঘ্রানে মেঘ জমলে পায়রাদীঘিতে জমা আলোটুকু মরে যেতে থাকে যেমন আঁচ কমে গেলে ক্ষীরের পদবী পেতে রাজহাঁস রঙা তরলটিকে শুকিয়ে উঠতে হয় । তুমি দেখো না শেষ প্রহরের ঢাক কীভাবে আকাশের উনুনে ভুজ্যি ঢালতে নাচে ? বোঝো না কণকাঞ্জলীর সময়েই কেন কন্যাকে সর্বাঙ্গসুন্দরী দেখানো বিধি ? তবুও ডালা জুড়ে পোড়া সিঁদুর আর ঘিয়ে ভেজা ধানের হিম গালে গালে সোহাগের নামতা লেখে , আর নীলকন্ঠ উড়ে যেতে যেতে প্রশ্ন রেখে যায় , খাঁড়াতে দু'ফোঁটা মধু ঢেলে নিলে নলী নরম হয়ে ছেঁড়ে ? " ..... আবার খাঁড়াহীন বিষদাঁতহীন চিরন্তন সেই প্রেমিকসঙ্গ পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর পাষাণী অহল্যাকবি হঠাৎই হয়ত এ' প্রবাহধারাপথে বলে ওঠে --- " ভ্রম ও ভ্রান্তির পলি সরে গেলে জেগে থাকে নির্লিপ্ত স্ফটিক চরখানি , ব্যথার কোন প্রতিচ্ছায়া পড়ে না কোনোদিন পদ্ম ও ভ্রমরের সংলাপে , পারদের চাঁদ ভেঙে জলে মিশে গেলে জোনাকিরা ধরে নেয় বহুজন্ম মীনদশা কাটালে আলেয়া হয়ে সাঁতারের অধিকার পায় শঙ্খচূড় দম্পতি " ।
যত এগোচ্ছে পাতা , মমিশব্দের স্রোত কোনো অদৃশ্য রিমোট্ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে অঘোরে হেঁটে চলেছে আগুনের গোলার মধ্যে দিয়ে । -- " গর্ভাশয় খুঁড়ছ প্ল্যাস্টিকের সেতু ভেবে ? " , .... " যে-চ্যুতি থেকে শিশু অশ্বত্থ আলোর হামা টানছিল , এখন হোম স্টে-য় পরিত্যক্ত বীর্যের চাষ করে " , .... " ১ . প্রজাপতির কঙ্কাল দেখে শুঁয়োপোকার বিরহ জাগে ? ২ . কুমির পিতৃস্নেহে কাছিমের ডিমে চুমু খায় ? ৩ . বুনো হাঁস উড়ে গেলে নেকড়ে কবিতা লেখে ? ৪ . সাপের খোলস দিয়ে বেজি পূজোর জামা বানায় ? ৫ . হাঙরের সুস্বাস্থ্যের রহস্য সামুদ্রিক আগাছা ? # উত্তরগুলি ভাবুন , আপনার সওয়ালের অধিক অবান্তর কোনোটিই নয় " । ( এই কবিতাটির নাম ' ধর্ষকের উকিলের কাছে-রাখা প্রশ্নপত্র ' ) , ..... " ঘুড়িটা কখনো জানবে না শিকলের রঙ ঘন হতে হতে রক্ত হয়ে গেলে যে কোনো মানুষ পাখির মাংস কিনে আকাশ দেখতে দেখতে বাড়ি ফেরে " , .... " সারসের নগ্নতা থেকে যে-আলো ঠিকরালো দগ্ধ পাঁজরের মতো ঘাতক হল না " , ...." মাস্তুলে আগুন ছিল আর জলচরের গর্ভ উপচে পড়ছিল হীরের জাতভাইয়ের অশ্লীলতায় " !
এ হেন মমির স্রোতের পাশে এককোণে দাঁড়িয়ে যদি মিষ্টি সুগন্ধি ছড়িয়ে যেতে থাকে রঙিন পাপড়ির হায়াসিন্থ , তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ায় ? না , ভুল হলো , হায়াসিন্থ নয় , বেহায়াসিন্থ । ..." বেহায়া " - পুরুষশাসনে নারীর এক বিশেষ চরিত্রগত রূপ । .... এতক্ষণের আলোচনা থেকে আশাকরি এ'টুকু স্পষ্ট যে প্রথাগত নারীসত্তার চূড়ান্ত বিদ্রোহে প্রকৃত ভালোবাসার অকূল প্রার্থনার মধ্যে দাঁড়িয়েও " মমিস্রোতে বেহায়াসিন্থ " কোনো নরম অনুরণনের মিষ্টি প্রেমের পমেটম কবিতার বই নয় । হালকা মেজাজে নরম কবিতা পড়ার নিবিড় পাঠসুখ এই কাব্যগ্রন্থ দিতে অক্ষম । ... কিন্তু তাহলে পড়ব কেন ? ... এর উত্তর একটি কোট্ করা কথায় দেবো । " The Hudson Review " নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক নাদিনে গার্ডিমারের লেখা বিখ্যাত ইতিহাসসমৃদ্ধ রাজনৈতিক উপন্যাস Burger's Daughter এর রিভিউ করতে গিয়ে লিখেছিল " ... gives scarcely any pleasure in the reading but which one is pleased to have read nonetheless " ।
ফিরে আসি " The Towering Inferno " তে । অগ্নিময় এই ছবির বিখ্যাত থিমসঙের প্রথম লাইন : " We may never love like this again " । .... " মমিস্রোতে বেহায়াসিন্থ " বইটিতেও একটি কবিতা আছে নাম ' ইনফেরনো ' , যার প্রথম লাইন -- " কখনো রসনীতির উল্কি গাঁথতে গাঁথতে ভেবো তো ... এমনও তো হতে পারে মেয়াদ ফুরিয়ে নির্বাসিত হয়েছেন ঈশ্বর " । আর বইয়ের শেষতম কবিতার শেষতম লাইন -- " এরপরের গদ্যে নিছক কলের করাত । ফিরল সন্ধ্যা , ভিজছে নিরাপদ আদিম অন্ধকার । সদ্য গোঁজামিলে গাঁথা পাঁচিলের খাঁজ থেকে অন্ধ ও প্রতিবন্ধী বৃক্ষটি একা দেখল চাতাল ডিঙিয়ে হারিয়ে গেলেন মুণ্ডহীন ধড়ের ঈশ্বর " । ... এইবার , তবে এইবার বোধহয় ভালোবাসার শুভ সূচনা , ঐশ্বরিক প্রতারণা সরিয়ে মায়া ও কায়ার প্রকৃত স্বপ্নকাহিনীর সূচনা । ফাল্গুনী বিকেলের আকাশ নীচে নেমে এসে স্পর্শ করবে শ্মশান গোরস্থান , মৃতরক্তমাংসে হয়ত বা ফুটে উঠবে আশ্চর্য কনে দেখা আলো , সূচনা হবে আবেগের অভিধানের , সূচনা রূপকথা লেখার , সূচনা সমানে সমানে প্রাকৃতিক চৌষট্টি কলার ।
We may never love like this again
Don't stop the flow we can't let go
We may never love like this again
And touch the sky though we may try
So while we're here let's give out all
Release the dreams inside us and set them free .
কবির কলমে দু'মলাটের ভেতর প্রতিটি চৌষট্টি পাতার কালো অক্ষরের আগুনশিখা ভবিষ্যতেও এভাবেই স্বপ্নমুক্তি ঘটাতে থাকুক , আমাদের স্বপ্নের , সোনালী স্বপ্নের , সোনালীর স্বপ্নের ।
................................
মমিস্রোতে বেহায়াসিন্থ : সোনালী চক্রবর্তী : প্ল্যাটফর্ম প্রকাশন : পৃষ্ঠা ৬৪ : মূল্য ১৬৫ / : প্রচ্ছদ- দীপশেখর চক্রবর্তী ।"

No comments:

Post a Comment