Monday, August 30, 2021

সোনালী চক্রবর্তীর গল্প "নীল"

 

  • "নীল
    -------
    "শুভ্র বলে এভাবে ধ্যানে থাক?"
    ---- "তাই কি? তাহলে এই যে কৃষ্ণপ্রস্তর ধারণ করছে আমার সমস্ত শরীরের উষ্ণতা, কেন দিয়েছি সে অধিকার তাকে আমি?"
    কৃত্তিবাসের উত্তরে মেঘ করে আসে। উরু দুটিকে ভাঁজ করে উঠে বসে সরিৎ। দৃষ্টিকে অবিচল রেখে কৃত্তিবাস তার স্বাভাবিক সৌম্যতাকে শান দিয়ে নেয় খানিক।
    "নারীর প্রতিশব্দই কি অভিমান সরিৎ? পাথরেও ঈর্ষা রাখ?"
    চরাচর তখন ভাসছে ত্রয়োদশীর আলোয়। আকাশ পূর্ণগর্ভা। সরিৎ আর কৃত্তিবাস পরিচিত উপত্যকায়। আধেক অরণ্য আর অনেক রুক্ষতা যাকে প্রায় জনবিরল রেখেছে এখনো।
    "মন তো নিজেই শিলা। না ভাঙলে কোনও স্রোতেরই কি জন্ম হয় কৃত্তিবাস?"
    ---- "আজ তোমার কী হয়েছে বলো তো সরিৎ ! এত দিন পর এলাম, আবার কবে আসি..."
    ------"জানতে ইচ্ছে হয়, কীসের তন্ময়তা তোমার? মাঝে মাঝে মনে হয় আমি, পর মুহূর্তেই মনে হয় এই প্রান্তর। এত নির্লিপ্তি কোন সুখে অর্জন করে পুরুষেরা, জানতে ইচ্ছে হয়।"
    ------"সত্যিই জানতে চাও ? বেশ শোন।"
    বহুদূর কোন গুহার ভিতর অনাহত উচ্চারণ ওঠে। ভারী হয়ে আসে কৃত্তিবাসের স্বর।
    "শুদ্ধতা আমায় বিহ্বল করে। যা আবরণ নামের আরোপিত অশ্লীলতাহীন, আমি তার উপাসক। প্রাণী বা জড়, যা অনাবিল, আমি তাতেই সমাহিত। এই যে তুমি, চাঁদ ছাড়া আর কোনো আচ্ছাদন নেই যার এই মুহূর্তে আর দিগন্তে উড়ে চলা ব্রাহ্মণ চিল টি, পরম সুন্দর। শিল্পীর প্যালেট দেখেছো কখনো? মিশে যায় সব রঙ অনুপাতে বা বেহিসাবে, জন্ম হয় নতুন রঙের। এই আমার দর্শন। অবলীলায় মিশিয়ে ফেলতে পারি তোমায়, এই কালখণ্ড, নিসর্গ...যাবতীয় কিছুকে আমার তরঙ্গে।
    -----"সেকী ! তাহলে নগ্নতাই দর্পণ? আধারের পার্থক্য নেই? যে কোনও কাউকেই শুষে নিতে পারো নিজের বৃত্তে?"
    -----"বড় আঁশটে ঘ্রাণ আসছে আজ তোমার চিন্তা থেকে সরিৎ। মানুষের উদ্দেশ্যের অভিমুখ, গতিধারা ভুলে গেছো তুমি ? সূক্ষ্মতা হারালে নাকি?"
    কৃত্তিবাসের সমুদ্রে ঢেউ উঠতে উঠতেও সরে যায় অন্তত কয়েক মুহূর্তের জন্য।
    "কেন? হ্যাঁ। ভুলে গেছি। কেনই বা মনে রাখব?"
    সরিতের উত্তরে শ্বাস কিছু দীর্ঘতর হয় কৃত্তিবাসের।
    ----"সেই... মথুরাপতিও বলতেন 'বিস্মৃতি তুল্য সুখ দুর্লভ'। বুঝিনি কখনো এই কথারও তোমার কাছে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন হবে। মানুষের অন্তর্গত সঙ্কট তাকে দিয়ে অনুশাসন নির্মাণ করায়, সে কি তুমি জানো না? গোষ্ঠী থেকে পরিবার হয়ে গ্রাম ও নগর। কোন ভয়ে সম্পর্ক প্রথা? যত জটিলতা তত অন্ধকার। সবই কৌশলসূত্র।"
    হয়তো বা আলোতেই সামান্য নরম দেখায় সরিৎকে এখন, কিছু তরলও।
    "ন্যায় ও নীতিকে তাহলে কোন অবস্থানে রাখবে কৃত্তিবাস? এই সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা অবান্তর?
    -----"কে বলেছে নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত পথে গ্রহ উপগ্রহকে আবর্তন চালিয়ে যেতে? কোন শাস্তি বরাদ্দ যদি তারা শৃংখলা ভাঙে?
    শোনো সরিৎ, যা নিজস্বতায় লীন তার কোনো দমননীতির প্রয়োজন হয় না। যেখানে শাষন জানবে অবশ্যই তার কারন আস্থা বা বিশ্বাসের ঘাটতি অথবা অবদমিত শোষনেচ্ছা আর এই পুরো স্ট্রাকচারের ফাঁক বোজাতে বিধি নিষেধের প্লাস্টার। এই মুহূর্তে যে প্রবাহে তোমার পা ডুবে আছে সেখানে চর তখন ভেসে ওঠে যখন সেতুর অজুহাতে অবরোধ নামে স্বাভাবিক ধারার বুকে। যেখানে বাধা সেখানেই বিপন্নতার বীজ রোপণ, ধীরে তা কালব্যাধি, পরিশেষে পচন। মানুষ পশু হত্যা করতো খাদ্যের প্রয়োজনে, এখনও সে হত্যাই করে, তবে স্বভাবে, অভাবে নয়, অপ্রয়োজনে, নিজের প্রজাতিকেও। কত বড় গলত শিকড়ে থাকলে ফল এত বিষাক্ত হয় ভাবতে পারো? বড় সমস্যা কোন জনগোষ্ঠীই প্রকৃতিনির্ভর নেই আর এমনকী দর্শকও নয়। আদি শিক্ষককে অবজ্ঞা করতে করতে ভুলেই গেছে তারা। জলোচ্ছাস, দাবানল, অতিমারী সমস্ত বেত্রাঘাতই তাদের চৈতন্য ফেরাতে অক্ষম থেকে গেলো, ক্লান্ত লাগে।"
    বহুক্ষণ স্তব্ধ শ্রোতা ছিলো সরিৎ। এবার সে সূত্র খুঁজে পায় অথবা ইচ্ছা।
    "তুমি আজ ঈর্ষার কথা বললে, আঁশটে ঘ্রাণের প্রসঙ্গ তোমার বিরক্তি থেকেই এলো হয়ত। এবার তাহলে আমিও তোমায় গোড়ার প্রশ্নটাই ফিরিয়ে দি। কেন আজও অভিমান শব্দে শুধুই নারীর অধিকার, তা কি জান? জানো তো নিশ্চয়ই, শুধু ব্যাখ্যা শুনতে চাইছি মাত্র। প্রবল পুরুষ তুমি, এত প্রার্থিত এত জনের। জানতে ইচ্ছে হয় তোমার ভিউ।"
    -----"কিছু দ্বন্দ্বের মীমাংসা নেই সরিৎ তাই তারা সুন্দর। অভিমান ভয়ংকর সুন্দর তার ভেদচক্র অনাবিষ্কৃত বলেই।"
    উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সরিতের মুখ। সে বলে ওঠে অচপল চাঞ্চল্যে।
    "হ্যাঁ সেই। যেমন কাউন্টার ন্যারেটিভের এই সুবর্ণ সময়ে লিঙ্গপূজা নিয়ে তোলপাড়ের সময় কেউ ভুলেও উচ্চারণ করে না, সম্ভবত জানানোর প্রয়োজনও বোধ করে না লিঙ্গ একা পূজিত হন বিরলতম কয়েকটি ক্ষেত্রে। প্রায় সর্বক্ষেত্রে তাকে ধারণ করে থাকে যোনি। শিখীপাখার মত চিন্হ সম্বল নয়, যোনি আর লিঙ্গ মিলেই পৃথিবীর প্রাচীন এবস্ট্রাক্ট আর্ট ফর্মটির পূর্ণাঙ্গ রূপ। সাধকেরা যাকে তপস্যা করে তুষ্ট করে জন্ম মৃত্যুর পার্থিব অলাতচক্র থেকে মুক্তি পেতে, সহজ কথায় যাতে আর জন্মাতেই না হয়। যখন তার জন্যেই শ্রাবণে স্বামী চেয়ে জলের দৌড় আর নীলে সন্তান কামনার উপবাস দেখি, অট্টহাসি আসে কৃত্তিবাস রিয়েলি, এই পরিণতি যে একরকম অসহায় বিষণ্ণতাও দেয় না, তাই বা বলি কী করে? অথচ তুমি যখন বলো তোমার শক্তির রহস্য আমার মায়া, মনে পড়ে যায় আরবীতে জলের প্রতিশব্দও মায়া। সৃষ্টি আর অস্তিত্বের অন্ত:সলীলা মায়া আর কেউই নয়, নারী, প্রকৃতি, পরাশক্তি অথবা নিছক জল, যে নামেই ডাকো, সত্য অবিকৃত থাকে কিন্তু দিন শেষে সে উপেক্ষিতই।"
    আয়ত চোখ গভীর হয়ে ওঠে কৃত্তিবাসের শুনতে শুনতে। তার পূর্ণ দৃষ্টি সরিতকে পদ্মনালের কথা ভাবায়। এই ভাষা পৃথিবীর প্রথম প্রাণের মতো পরিচিত তাদের কাছে।
    "নারী ভুলে যায়, ভুলে থাকতে চায় প্রতিটি কক্ষপথের নিজস্ব আকর্ষণের সঙ্গে সমানুপাতিক বিকর্ষণের তত্ত্ব অথচ তাকেই রক্ষা করতে হয় বন্ধনের দায়। এই ই দ্বন্দ্ব আর এই ই অমীমাংসনীয়। আজ কত কথা বললাম আমরা সরিৎ, তাই না?"
    সরিৎ ও কৃত্তিবাস।
    এক অতিবৃদ্ধ। উপত্যকার প্রস্তর অথবা বৃক্ষের মতই যার বয়স অনির্ণেয়।
    এক নারী। তরঙ্গকে যে কোন প্রশ্নের মতো অবান্তর যার ধীকে ভেদ করা।
    তবে সরিতের জন্মরহস্যের কিছু ছায়ার কৃত্তিবাসও অংশীদার। অন্তত জনশ্রুতি এমনই। যে সঙ্গম আত্মার চাহিদা থেকে কায়ার মোহনায় পৌঁছায় তার যুক্তি তক্কো না থাকলেও বলয়ে গপ্পো অবশ্যই পর্যাপ্ত থাকে।
    সুতরাং এরপর নির্জনতা বাকরুদ্ধ হয়ে সাক্ষী হতে থাকে সম্পর্ক, সমাজ, নীতি, প্রকরণ যাবতীয় মানবিক ব্যাকরণকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে ‌উর্ধ্ব অধ: আর অধ: উর্দ্ধের আদিম ভাস্কর্যের।
    এবং ধীরে চাঁদ ডুবে যায় সলাজে...
    ফেডেড ব্লু ফাটা জিন্স পরা বাচ্চাটা দৌড়াতে দৌড়াতে খবর নিয়ে আসে মালিকের কাছে, সে তখন ব্লু ফিল্ম দেখছিলো চারপাইতে আধ শোয়া হয়ে।
    "জ্যায়সা ঢুঁন্ড রহে থে ইত্ণে দিন, আ গ্যয়া, চলিয়ে অভি, পুরনমাসা ভি লাগ গ্যয়ী"
    ----"বোল ক্যায়া রাহা হ্যায় বে পতা ভি হ্যায়? আগর সচ হুয়া শাম কো ইংলিশ মিলেগা ঔর গলত নিকলি তো তুঝে পতা হ্যায় মালিশ ক্যায়া চিজ"
    ভারতবর্ষের কোটি চোরবাজারের একটা সোর্স নর্মদা তীরে প্রো এক্টিভ দীর্ঘদিন। ছোট বড় মাঝারি ভেসে আসা নুড়িদের ঘষে মেজে সাধারণ মাঝি মাল্লারা জেলে বস্তিতে বিক্রী করে দেয়। সেখান থেকে পালিশ হয়ে বাজারে পৌঁছালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যায়। কিন্তু বিশেষ বিশেষ তিথি নক্ষত্রে ব্যতিক্রমী কিছু এলে তাদের অধিকার নেই ছোঁয়ার। ক্ষমতার জাল বহু আগে বন্ধক নিয়েছে দারিদ্র্য। চিলেরও অসাধ্য ছোঁ তে পাচার হয় দাদন দিয়ে রাখা মাড়োয়ারি শিল্পপতিদের কাছে। যারা সেই নুড়ির কিছু প্রতিষ্ঠা করেন গৃহে বেওসার কল্যাণে, মেয়েদের ধনবান পতি আর ছেলেদের পুত্রসন্তান কামনায় আর বাকি ডেলিভারি দিয়ে দেন চোরাই এন্টিক হিসাবে বিদেশে। মু মাঙ্গি রকম দিয়ে সোম বচ্ছর দালাল পালেন তারা সাপ্লাই পেতে। তাদেরই একজন লিপট আর শাগরেদ বাচ্চু। নীল আকাশের নিচ দিয়ে তারা দৌড়চ্ছে এখন খবরের সত্যতা যাচাই করতে। নীলাভ অপরাজিতা রঙের উজ্জ্বল পাথরটি তখন হেসেই চলেছে প্রখর সূর্যের আদরে ..."

No comments:

Post a Comment