Monday, August 30, 2021

সোনালী চক্রবর্তীর গদ্য

 

"কাকে কী বলেছিলাম" থেকে "ভুল চিকিৎসার মৃতদেহ" হয়ে "অপাবৃণু"..
 
পরিব্রাজন আদতেই এক সৎ প্রতারণা মাত্র- এই কথার মানে বুঝতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে দুই একটি লেখায় নয়, প্রথম থেকে এই অব্দি প্রকাশিত তিনটি কাব্যগ্রন্থের জয়দীপ মৈত্রকে (Joydeep Moitra) পড়া দরকারি হয়ে পড়ে। প্রতিটি কক্ষপথ নির্দিষ্ট হলেও অনপেক্ষ নয়, এবং বিবর্তন শব্দটি সর্বদাই যে লেখনী সাপেক্ষে ব্যবহৃত হবে, এই মিথের অসারতা ভাঙার সময় এসেছে, একথাও বলা এই মুহূর্তে জরুরি ঠেকছে।
প্রথম বইটিতে জয়দীপ তাঁর ব্যক্তিগত দর্শনের প্রমাণার্থে যে মেটাফোরগুলি এনেছেন তার অধিকাংশই সংসার ও গৃহলতা, নিজস্ব উৎসের ঔরস ও গর্ভ সম্বন্ধীয় অথচ তাতে সম্পর্ক প্রসঙ্গে কোনো প্রত্যাশা অথবা হতাশা নেই। দ্বিতীয়টিতে অসহায়তা আছে এবং তা ইলিউশন বা মায়ার আঁশবিহীন। যেহেতু জয়দীপ তাঁর দর্শনের মূল বস্তু ও তার প্রকাশের ভাষা বিষয়ে পর্যায়ক্রমে অত্যন্ত স্পষ্ট আর নির্মম উদাসীন সুতরাং একথা সংশয়াতীতভাবে বোঝা যায়, তাঁর কোনো জার্নি বা গন্তব্য নেই। তিনি যেখানে পৌঁছে আবরণ সরাতে সরাসরি প্রস্তাব রাখছেন হিরন্ময়ের কাছে তৃতীয়টিতে, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকাকালীনই তাঁর যাবতীয় লেখার জন্মের অনুমতি তিনি দিয়েছেন যতই সময় ও গ্রন্থনার দিক থেকে তারা ভিন্ন অবস্থানে থাকুক। এখানেই জয়দীপকে শুধুমাত্র 'কবি' সম্বোধন করা যাচ্ছে না আর মিলিয়েও ফেলা যাচ্ছে না তাঁর সমসাময়িকতার সরলরৈখিক তুলায়। তাঁর নশ্বরতা এমন একটি স্তরে নিজের চৈতন্যকে প্রসারিত করতে সক্ষম হয়েছে যেখান থেকে পঞ্চভূত নির্মিত প্রতিটি উপাদানের আপেক্ষিক রূপ যে আদতেই বিপুল দৃষ্টিভ্রম তা প্রবল স্বচ্ছতায় দৃশ্যমান সে বাঁশি হতে পারে অথবা জাল, পালক অথবা মাছ, অথবা এগুলো দেখার চামড়ার চোখগুলি।
আমরা তাঁকে পড়তে পারি নিশ্চয়ই কিন্তু সম্যক উপলব্ধি করতে বসলে আত্মা থেকে আসে অথবা সেই অব্দি পৌঁছে দেয় এমন সংযোগ সূত্রের সন্ধান রাখাও অপরিহার্য। শিরোনামের ছেলেমানুষী জয়দীপের নেই কারণ ঐ যে বললাম, যে স্তরে তিনি দাঁড়িয়েছেন, দেখছেন, সেখানে পারিপার্শ্ব সবই অনিত্য ও অপ্রাসঙ্গিক। পাঠক হিসাবে আমার দীর্ঘশ্বাস আসে আর সেই দীর্ঘশ্বাসকে অনায়াস আসন করে বসে থাকা জয়দীপকে অভ্রান্ত দেখা যায়। আমি নত হই, নিজের পা ভিজে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বক্তব্যজাতীয় অর্জন গুছিয়ে উঠতে পারি না। জয়দীপ অসামান্য নির্লিপ্তিতে বুঝিয়ে দেন, ব্রহ্মকুম্ভে ধুনি সর্বদাই জ্বলছে, আর কমলবনে সর্বদাই ঘনিয়ে আছে সারস্বত এক ছায়া। শুধুমাত্র অহং সর্বস্ব হয়ে থাকায় আমরা তাঁর মত করে কিছুই ছুঁতে পারছি না। জয়দীপ সম্ভবত জন্মেইছেন বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে বাংলা কবিতা ও কবির প্রচলিত সংজ্ঞাগুলোকে নিশ্চিন্হ করে দিতে এবং তিনি তা করেছেন। প্রণাম থাকল।

No comments:

Post a Comment