Sunday, July 30, 2023
Sunday, June 18, 2023
Thursday, June 8, 2023
Sunday, April 30, 2023
Monday, April 24, 2023
Saturday, April 15, 2023
Tuesday, March 28, 2023
Sunday, March 5, 2023
Friday, January 6, 2023
Sunday, January 9, 2022
তাহতাজিজ
তাহতাজিজ
আয়াত ভুলে যাবে এতটা জুঁই এঁকে দিতে ইচ্ছে করে হৃদিতে- সিরোজেম উড়ে যাওয়ার স্বরে উচ্চারণ করলো স্বধা। তার থেকে সায়রের দূরত্ব এই মুহূর্তে বুদ্বুদের ভিতরের শূন্যতার সঙ্গে স্বাভাবিক জলীয় বাষ্পের ঠিক যতটুকু অনুমিত। বারো বছরের জন্মদিনে ॐ আকৃতির পেনডেন্ট দেওয়া যে চেনটি শ্রী তাকে পরিয়ে দিয়েছিলো, আঠারোর পর থেকে আর কখনো তা খুলে রাখার সুযোগ পায়নি যেহেতু সে সেই সময় থেকে শ্রীনজরের কাজললতার ভূমিকায়। ভুলেই গিয়েছিলো এতোদিন নিজস্ব রক্ত চামড়ার বাইরে আলাদা করে সেটির অস্তিত্বের কথা, যেভাবে মরচেরা ধীরে পরমাত্মীয় (সম্ভবত একমাত্রও) হয়ে যায় পরিত্যক্ত যে কোনও লৌহ সম্পদের। সায়রের আঙ্গুল সেই ॐ কে সরিয়ে দর্পণের অবস্থান দেখতে ও দেখাতে চাওয়ায় শতভিষার আদেশে চরাচর থির হলো ক্ষণ কয়েকের স্বার্থে।
- "তোর এখানে আছি আমি, এখানে। কেন? কেন এনেছিস? কেন রেখেছিস? এবার মুছে দে। আমি ভয় পাচ্ছি। অপরাধী হয়ে গেছি। তোকে অস্বীকারের অজুহাতটা তো বিছাতে দে, অন্তত এবার। কিছু বলিস নি। একটা অক্ষরও না। তিরিশটা দিনের প্রতি সেকেন্ডে আমি অপেক্ষা করেছি সূক্ষ্ম চ্যুতির, সামান্য সূত্রের। পাই নি। এভাবে আমায় হারিয়ে কী পাচ্ছিস তুই? আজও এখানে দাঁড়িয়ে আছিস পাথরের মতো, ঠোঁটের এই ভাস্কর্যকে হাসিই তো বলে, না? কোথায় জল দেখতে চাইছি আমি? মেঘই জমেনি এক বিন্দু। নিশ্চিন্হ করে ফেলতে ইচ্ছে হয়। কে জানতে পারবে বল? যে কোনো ডাক্তার আদতেই নিপুণ খুনী হতে পারে যদি সে চায়, ন্যূনতম প্রমাণও থাকবে না। খাতায় কলমে আমি এখন ষাট কিমি দূরের হাসপাতালে অন ডিউটি। কে বিশ্বাস করবে, আমি নিজেও কি করবো, পরের দিন কারোর ডিসচার্জ সার্টিফিকেট লিখতে হবে বলে মাঝরাতে ড্রাঙ্ক সায়র সেন নিজে এক ঘণ্টা ড্রাইভ করে এসে পৌঁছেছে নিজেরই নার্সিংহোমের পাশের পোড়ো জমির অবসলিড স্পেসে? অথচ কেউ তাকে ডাকেনি। সে বাধ্য হয়েছে। আমি ভুডু মানিনা। এই পৈশাচিক আকর্ষণের ব্যাখ্যা কী? উত্তর দে।"
--"পেনডেন্ট আমার কতটুকু স্কিন তোর চোখের আড়ালে রেখেছিল যে এতো ঈর্ষা এলো?"
---"স্বধা..."
----"শুনতেই তো চাইছিস, তাহলে কেঁপে উঠলি কেন?"
-----"উত্তর লাগবে না। চুপ কর। একটা মাস আমি ধ্বস্ত নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে। তোকে আমি কী দেব? কিছুই না। সেই অধিকার আমার নেই ই কিন্তু সে কৈফিয়ত আমি কাকে শোনাবো? যার নিশ:ব্দ উথালপাথাল আমি প্রতিটা মুহূর্তে নিজের বেড়ে যাওয়া শ্বাসের গতি দিয়ে টের পাই। বলেছিলাম আমার হাতে তোর বাবার সারভাইভ্যাল চান্স পাঁচ শতাংশ। এত অতলান্ত নির্ভরতা কীসের তোর যে তা জেনেও তুই বন্ড সই করলি? সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে মন্ত্রীমহল অবধি নার্সিংহোমের গাফিলতি নিয়ে আক্রমণের সময় সমস্ত দায় নিজের উপর নিলি কেন তুই? কীসের কৃতজ্ঞতা এতো তোর? কেন আমায় নিয়ে এই রেঞ্জে তুই সেন্সিটিভ?"
------------- " ময়াল খুঁজছিলি না? আলমুস্তাফা বলেছিলো- 'আদিম সর্পটি নিজের খোলস থেকে নির্বাণ পায়না বলেই প্রতিটি প্রেমকে নগ্ন ও নির্লজ্জ দেখে'। আর আজ স্বধা তোকে বলছে- 'সেই সুপ্রাচীন সর্পকেই তুমি প্রেম নামে চেনো অনিবার্য নির্বাণ আঁকা যার প্রতিটি খোলসে'। "
--------- "নীলাদ্রি স্যার তোর কাছে কী আমি জানি। যখন প্রথম বলেছিলি "You belong just next to the Almighty", আমি আমার গুরুত্ব টের পেয়েছিলাম কিন্তু তোকে আঘাত দিয়ে হলেও সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে চাওয়ার সময় যখন ধাতব ছুরির মতো কেটে কেটে জানিয়ে দিলি- "ঈশ্বর মানে বুঝিস? যার কাছে প্রত্যাশার অধিকার মাত্র থাকে কিন্তু অভিযোগের নৈকট্য থাকে না। বিধি নির্ধারিত। ঈশ্বরনির্মিত হওয়ায় তিনি নিজেও তা ভাঙতে পারেন না" - নি:স্ব হয়ে গিয়েছিলাম- এই ভার কী করে ওঠাব? এই প্রবল সমর্পণের?"
---------"এতো যন্ত্রণা পাচ্ছিস...সিগারেটটা ফ্যাল। ভাঙা শেডের পুরনো ধুলোর উপর চকচকে নতুন ছাই অশ্লীল লাগে। তোকে বরং ফিল্মি ডায়লগ শোনাই। মনকে সারা । আফটার অল গ্যারেজ এটা।কোনটা বলি? 'হর ইশ্ক কা এক ওয়াক্ত হোতা হ্যায়। ও ওয়াক্ত হামারা নেহি থা ইসকা মতলব ইয়ে তো নেহি কে ও ইশ্ক নেহি থা'- নাহ, এটা বছর উনিশ কুড়ি পরে বলবো যখন তোর মেয়ে ডাক্তারি পড়বে, তোদের তিন পুরুষের ঐতিহ্য অনুযায়ী। শুধু 'পুরুষ' এর জায়গায় 'নারী' বসাতেই নাহয় ডাক্তার হলো সে, কী বলিস? তাহলে এখন কী বলা উচিত? 'মুহব্বত হ্যায় ইস লিয়ে জানে দিয়া, জিদ হোতি তো বাহো মে হোতা' - পারব না সায়র। এই তত্ত্বে আমি বিরোধ রাখি। যেতে দেওয়ার আমি কে? কোথায়ই বা যেতে দিলাম? কে কাকে যেতে দিতে পারে? তুই বলবি তোর হাতের রেখায় আমি নেই। আমি তোকে গালিবী অহংকার ছুঁড়ে দেবো- 'হাতো কে লকিড়ো পে মত যা, এ গালিব, নসিব তো উনকি ভি হোতি হ্যায় জিনকে হাত নেহি হোতে'। এইভাবে এই পরিত্যক্ত দেওয়ালেরা তর্কের পারদে আতুর হয়ে উঠবে, ধীরে শরীরী মর্ফিয়ারা সংশ্লেষের অন্ধকার গন্তব্যে এগোবে। সূর্য উঠলে চরাচর জুড়ে অজস্র ছাই- অনুশোচনার, গ্লানির, ক্লান্তির। আমি এত নরম সওদা করিনা রে। যেভাবে কোথাও কোনো প্রমাণ নেই আজ এই মুহূর্তে তুই ঠিক কোথায়, ঠিক সেভাবেই স্বধা কোনোদিন কিছু উচ্চারণ করেছে কেউ শোনেনি- এই ই সত্য।
------"ধ্বংস এতো ভালোবাসিস?"
---------------"কাল সাক্ষী সায়র, কোনোদিন কোনো ভালোবাসা ধ্বংস গাঁথেনি। তা আনে কেন্দ্রটিকে অধিগ্রহণের দুর্দম স্কারলেট জিহাদ। ইদানিং সবকিছুরই 'লাইট' ভার্সন হয় তো, ভেবে দেখিস 'ধর্ষণের কারণ পোশাক' কথাটা 'যাবতীয় মহাযুদ্ধের কারণ কোনো না কোনো নারী' এই চিন্তনের লাইট এডিশনটা কিনা। "রামায়ন"-এর প্রায় তিনশ'টি সংস্করণের মধ্যে সর্বাধিক পঠিত বা প্রচারিত নিশ্চয়ই বাল্মীকিরটা? রাম-সীতার প্রণয় সম্ভাষণগুলো পড়ে ওঠার ঘোর কাটিয়ে যারা যুদ্ধশেষে পায়ে হেঁটে অশোকবন থেকে ফিরতে বাধ্য হওয়া কুললক্ষ্মীকে বলা পুরুষোত্তমের যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্বন্ধীয় মর্যাদাঘন বক্তব্যে পৌঁছতে পারেন, অবশ্যই জানেন সেটির থেকে অগ্নিপরীক্ষা অনেক সম্মানজনক। "মহাভারত" নিয়ে কী আর বলি? ছেলেভুলানো শাক দিয়ে প্রকৃত প্রস্তাবের মাছকে ঢাকার চেষ্টা যে কী প্রকট রে এখানে। স্পষ্ট লেখাই আছে ভিক্ষাভাগ রূপক মাত্র। অর্জুনের সঙ্গে আসা কৃষ্ণার দিকে বাকি তিন পাণ্ডবের দৃষ্টির নির্লজ্জতা দেখে ধর্মপুত্রের বুঝে নিতে পলমাত্র লাগেনি, যদি এই নারী তাদের মধ্যে শুধু একজনেরই অঙ্কশায়িনী হয়, কৌরবের প্রয়োজনই পড়বে না, না ধর্ম নামক রসিকতার, মহাযুদ্ধ আসন্ন আর আর তা পাণ্ডবগৃহেই। অতএব বাঁটোয়ারা ঘট স্থাপন করে পঞ্চপল্লব দিয়ে শান্তিজল ছিটিয়ে দাও। অপরাধ তো দ্রৌপদীর রূপেরই। ঠিকই। অথচ সে অবাঞ্ছিত। পাঞ্চালরাজের পুত্রকামনার যজ্ঞ থেকে উত্থিত বাইফারকেশন মাত্র, তৈল শোধনাগারে যেমন ভেসলিন। আহা এমন বায়াসড হচ্ছি কেন ভারতখণ্ড নিয়ে। ট্রয় মনে পড়ছে। অন্ধ সে মহাকবি বিরচিত আদিতম দুটি মহাকাব্যের জন্ম দিয়েছিলো সে রণ। হেলেন কারণ ছিলো তার আদৌ? উত্তর শুধু স্ক্যামেন্ড্রসের ঢেউ আর একিলিসের গোড়ালি জানতো। সেই কবে লিখেছিলাম- মিথ মানে অর্ধসত্য চুপকথার রূপসী বিনুনী। কই প্রামাণ্য নথিনির্ভর বিশ্বযুদ্ধগুলো নিয়ে তো কথা হয়না। তাদের ধ্বংসপ্রভাবকে ইগোলোসাইজ করা যায় না বলে? শোন সায়র, বডি শেমিং এটাও। যেভাবে খুঁত কেউ ইচ্ছেয় নিয়ে জন্মায় না বলে বিকৃতি নিয়ে ব্যঙ্গ অপরাধ ঠিক সেভাবেই কেউ নির্বাচন করে নিখুঁত হয়ে আসেনা বলে তার সৌন্দর্যকে অপরাধী করা পাপ। কী সহজে বলে দিলি ধ্বংস ভালোবাসি। ধ্বংস আসবে কেন? ভালোবাসা কি তোর কাছেও অধিকারের দাসত্বনির্ভর অসভ্যতা? ধারণ নেই? শুধুই প্রদর্শন অথবা সাম্রাজ্যস্থাপন? সে সমুদ্রকে আমি 'মহা' বিশেষণ দেবো কেন যে তার ঝঞ্ঝাকে গর্ভে রাখতে পারেনা? সে বৃক্ষকে আমি 'প্রাচীন' স্বীকার করবো কেন সহস্র কাঠুরিয়া যার সামনে নতজানু হয়ে বসেনি? ভালোবাসাকে নারী পুরুষ নির্বিশেষে আবহমান শুধু হিমদুর্বল করে রেখে দিলো, তাকে আগুনের ব্যবহার শেখালো না। দহনে সব প্রত্যাশা জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে পড়ে থাকবে নিখাদ শুদ্ধ বোধটুকু- আমি ভালোবাসি- শুধু এই বোধ নূপুরের মতো ঘিরবে চৈতন্যের মেহফিল- "ঘিরি ঘিরি ঘিরি নাচে"- যাবি সাবিত্রী বাউলের আখড়ায়? দেখ, এই তোর ঠোঁট, কাঁধ, গলা- রক্তাক্ত করে দিতে পারি আমি এই মুহূর্তে। নখ দাঁত নেই আমার? কিন্তু তাতে এই অহং কি আমার আর থাকবে যে তোকে এতো তীব্র চেয়েছি, তুচ্ছ কিছু দিয়ে ম্লান করে ফেলিনি? পারবি এমন ভালোবাসতে? "
------" বাসিনি? রাতের পর রাত স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় পিরিডয়িক ক্র্যম্পের পেন নিতে না পেরে যখন মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলি ব্যালকনিতে, কে তুলে নিয়ে এসেছিলো নিজের হাতে ঠিক পনেরো মিনিটের মধ্যে? কোনোদিন তোর সন্দেহ হয়নি নার্সিংহোমের বাকি একজনও ভোরের আগে যা জানতে পারত না, আমি কী করে জানলাম? পাঁচটা নার্সিংহোমের অজস্র উইং আর ফ্লোর, রুম, কেবিন জুড়ে হাজার খানেক সি সি আছে স্বধা, পঁচিশ জন অবসার্ভার আছে সব মিলিয়ে সেগুলোর জন্য, একমাত্র ইডেনের কেবিন ওয়ান বাদে। সেটার লিঙ্ক আমার ফোনের সঙ্গে করা। আমার কথা ছাড়, আর কার সম্মানের কথা ভেবেছিলাম সেই সময় আমি? বিধায়ক মা, ডাক্তার বাবা, প্রফেসর বৌ- সমাজ সংস্কার সর্বস্ব ভুলে গিয়েছিলাম। ইডেনের কোনো স্টাফ তার আগে চরম ইমার্জেন্সিতেও আমায় ঐ চেহারায় দেখেছে? সেদিন চোখ খুলে প্রথম আমার মুখটাই কি দেখতে পাসনি? তখনো তোর বরফের মতো আঙ্গুলগুলো আমারই মুঠোয়। হ্যাঁ, তুই সেন্সে ফেরার পর আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াইনি, সেটা বলতে পারিস। "
---------"এক্স্যাক্টলি এটাই বলছি। লোকলজ্জাকে উপেক্ষার সায়র যতটা সত্য আমার কাছে ঠিক ততটাই দামি মুহূর্তে নিজেকে সংবৃত করে নেওয়া পুরুষটি। বলেছি না, নরম সওদা করি না? আই রিপিট, তোর উচ্চতা আর আমার ধারণ- বিকাউ নয়। তোর দ্বন্দ্ব- সংশয়- ভয় নির্ধারণ করে দিচ্ছে যে নীতিমালার শৃগালটি, যে তোকে শেখাচ্ছে স্বধা ধ্বংস আনবে, তাকে জানিয়ে দিস, স্বধা বলেছে- প্রতিটি হৃদয় নিপুণ ও অসংখ্য প্রকোষ্ঠ নির্মিত মহাকাশ। পতঙ্গ তাকেই নির্মাণের অনুকরণ করে মানুষ যা নিয়ে জন্মায়। এখানে কারোর প্রতি অনুভূতি অন্য কারোর অরি বা মিত্র হওয়া তো দূর, সম্পর্কিতই হয় না। যে যার নিজস্ব স্বাতন্ত্রে, স্বাভিমানে, স্মৃতিতে রাজ করে। শম আর দমের শাসন যদি আয়ত্বে আসে, রিপুযন্ত্রটি বড় যত্নে রামধনুর চাবি দিয়ে দেয়। একটিমাত্র রং দিয়ে বৈরাগ্য বা বাসর সাজায় মানুষ তার চামড়ার শরীরে। আকাশ-জল-বৃক্ষ- ঈশ্বরের নগ্ন শরীরের কোনো অংশের সঙ্গে তার সাযুজ্য আছে কি? নেই, থাকা সম্ভবও না কারণ তা সিদ্ধ। মানুষও পারে যদি নিজেকে উত্তীর্ণ করে। তুই হ, আমি আছি। দেখ, দক্ষিণ মধ্যমা দিয়ে চন্দ্র লিখে দিলাম তোর রুদ্রচিন্হে। আজ থেকে তুই স্বধার ধারণের অংশ। যখনই খুঁজবি, চোখ বন্ধ করলে এখান থেকে শুনতে পাবি-
"... as love crowns you so shall he crucify you... Love possesses not nor would it be possessed... For love is sufficient unto love... to bleed willingly and joyfully" "
Friday, January 7, 2022
হয়তো এ ঘুঙুর সময় অনন্ত বরফেরই হলো
হয়তো এ ঘুঙুর সময় অনন্ত বরফেরই হলো

।। সোনালী চক্রবর্তী ।।
আদরিণী, কিছু পিঙ্গল বসন্তশোক
আলগোছে তুলে রাখা ভালো,
বলা কি যায়,
হয়তো এ ঘুঙুর সময় অনন্ত বরফেরই হলো!
কতদিন ভুলিয়ে রাখবে নিজেকে,
সমুদ্র কখনো উচ্চারণ করে?
‘মধু ক্ষরন্তি সিন্ধব’…
হেমন্তরেখা
টলটলে গর্ভ নিয়ে শীত খুঁজছে
বিবাগী রোদ্দুরের সর,
আর তুমি দাঁড়িয়ে আছো,
অবিকল অতীতে হেঁটে যাওয়া সাধক শালপথ।
বৃক্ষ নয়, পাতাদেরই খুঁজি,
ঝরে পড়ায় যে নির্লিপ্তি,
হয়তো, তারও পরে লুটিয়ে থাকায়
অধিক সমাধি।
ভেসে ওঠার ছিলো,
যাবতীয় যুদ্ধ শেষে প্রান্তর ও পাঁজরের,
দূর থেকে চন্দন মনে হবে,
সেই সব ধূসর তিমির মতো অলীক উপকূলে।
অথচ, ডানা খুঁজতে খুঁজতে
দিকভ্রান্ত দ্বিপদী জনমে
যেভাবে কেউ কেউ তীর আর বাকিরা…
ব্যাধ হয়ে যায়,
খানিক মায়া আধেক আলেয়া নিয়ে
মারুফিয়া দহে ঝিঁঝিঁমতো ডুবে গেলে।
বলেছিলাম,
আদরিণী, কিছু পিঙ্গল বসন্তশোক
আলগোছে তুলে রাখা ভালো,
বলা কি যায়,
হয়তো এ ঘুঙুর সময় অনন্ত বরফেরই হলো!
কতদিন ভুলিয়ে রাখবে নিজেকে,
সমুদ্র কখনো উচ্চারণ করে?
‘মধু ক্ষরন্তি সিন্ধব’…
ম্যাগমা
ঘৃণার বাদামে তাকিয়ে জানা গেলো জোয়ার সমাগত, যেভাবে সামান্য সাদা পরী মহাকাশে রেখে যায় অজস্র ছাই নিতান্ত অবহেলে। তবুও অঘ্রাণে বৃষ্টি এলে এখনো মনে হয় যতটা দহন পুষি, কিছুটা বারুদ পেলে দাবানল ভিজে যেত। বনমালী, প্রেমিকেরা রিরংসায় কেন আমি পাঞ্চালী, তারা জানেনা তুমিই রূহদার আজন্ম আভূমি। অভিযোগ নেই, ঘাতক চিনি না বলে জিভের নরমে প্রলোভনেরা শাতিল হয়ে গেলে আমি আজও বলতে পারিনি “মামেকং পরমং ব্রজ” হে মাধব এই তোমার আদরিনী
প্রতিসরণ
অদ্ভুত সন্তুর কড়ি ধোয়া বৃষ্টির ছাঁটে, ‘মাধব মাধব বাচি’ শুনতে চেয়ে শিউরে উঠে কেন যে ভাবলে… মাছেরা আবীর মেখে কোনো এক গলিত রাসের চূর্ণ চীনা লণ্ঠনে, মৃত কীটের কলঙ্ক পেয়েছিলো বিনিময় সোহাগে, দ্বিধারা সেই হতে দ্বিধাগ্রস্ত কৃষ্ণগহ্বরে।
অপরিমেয় আলো অথচ অনির্বাণ মনখারাপের সুতো শীত সন্ধ্যাদের শরীরে, যেন গ্রীবার ময়ূর ভেঙে সিঁথিতে নীল জড়িয়ে রেখেছে আদরিণী বেশুমার বিরাগে।

সোনালী চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও অনুবাদক । ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর । ২০১৬ সালে প্রত্যক্ষ লেখালিখির জগতে যুক্ত হওয়ার আগে পরিচয় ছিলো ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী । বর্তমানে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে গবেষণারত । প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ১| ‘জামার নীচে অলীক মানুষ’ (২০১৭) ২| ‘পদ্মব্যূহে নিম অন্নপূর্ণা’ (২০১৯) ৩| ‘মমিস্রোতে বেহায়াসিন্থ’ (২০২১) সম্পাদিত গ্রন্থ ‘ষটচক্র’ (ভারত বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগ, ২০১৯) ও “সংকলিত বাক্” (২০১৯) । কবিতার সঙ্গে নিয়মিত অনুবাদক বিশ্বসাহিত্যের । অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ‘নীলগিরি ওয়াগন’, ‘দি ডেইলী স্টার’, ‘অংশুমালি’-সহ ভারতের বাইরের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এবং কবিতা পঠিত হয়েছে ‘দিল্লী সার্ক সম্মেলন’- এ ।
Monday, November 8, 2021
এলেন গিন্সবার্গের কবিতা
এলেন গিন্সবার্গের কবিতা
সোনালী চক্রবর্তী
বিট জেনারেশনের অন্যতম প্রবক্তা আমেরিকান কবি আরউইন এলেন গিন্সবার্গের জন্ম ১৯২৬ সালে। তাঁর প্রতিটি কবিতা তীব্র প্রতিরোধের দলিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক আগ্রাসন আর যৌনতার অবদমনের বিপক্ষে। তাঁর সর্বাধিক বিতর্কিত কবিতা “হাউল” এর জন্য তাঁকে অশ্লীলতার দায়ে রাষ্ট্র কর্তৃক অভিযুক্ত করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এলেন তাঁর ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত অনাড়ম্বর যাপনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাপেক্ষে রচিত তাঁর “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” কবিতাটি বাঙালি উদ্বাস্তুদের মর্মন্তুদ বেদনাকে ব্যাখ্যায়িত করেছে। যে রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর আমরণ জেহাদ পরবর্তীতে সেই রাষ্ট্রই তাঁকে বিভিন্ন সম্মানে সম্মানিত করেছে। আজীবন যুদ্ধের বিপক্ষে গান গেয়ে যাওয়া কবি এলেন ১৯৯৭ সালে নশ্বরতা থেকে মুক্তি নেন।
আসমানি ফেরেস্তাটি
সমুদ্রতীরের অধিত্যকায়, হামানদিস্তা গাছে হেলান দিয়ে,
মার্লিন এক যান্ত্রিক প্রেমের জন্য বিলাপ করছে।
সে এক পূর্ণাকার খেলনা, অমরত্বের পুতুল,
শুভ্র ইস্পাত নির্মিত অবাস্তব কোনও টুপির আকারের তার চুল।
পাউডারমাখা, চুনকাম করা তার মুখ যন্ত্রমানবের মতো স্থাবর,
কপালের পাশে, একটা চোখের ধার থেকে ঝিলিক দিচ্ছে একটা ছোট্ট সাদা চাবি।
চোখের সাদা অংশের ভিতর গাঁথা নিষ্প্রাণ নীল তারারন্ধ্র দিয়ে,
সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,
চোখ বন্ধ করতেই চাবিটা নিজে থেকে ঘুরে গেল।
সে চোখ খুলতেই, জাদুঘরের ভাস্কর্যের মতো তারা অমিত্রাক্ষর হয়ে উঠল,
তার যন্ত্র গতিশীল হয়ে উঠতেই, চাবিটি আপনা থেকে আবার পর্যায় বদলে নিল।
আপনারা হয়তো ভাবছেন,
অন্তঃস্থিত উৎপীড়নের সমাপ্তির জন্যে এ আমার কোনও পরিকল্পনা,
কিন্তু আমার চিন্তাকে দখল করে রাখবে,
এখনও অবধি এমন কোনও পুরুষ আমি খুঁজে পাইনি।
একটি ঊষরতার কথা
মেঘমুক্ত আকাশের মতো এখন চেতনা বিশুদ্ধ,
সুতরাং এখনই তো সময় বিজনপ্রদেশে গৃহ নির্মাণের।
চোখ দিয়ে প্রলাপ বকা ছাড়া কী-ই বা করেছি বৃক্ষে?
অতএব স্থাপনা হোক, দারা-পুত্র-পরিবার, যাচ্ঞা করি প্রতিবেশী।
অথবা, ধ্বংস হয়ে যাই একাকীত্বে, নতুবা ক্ষুধার তাড়নায়,
বা অশনিতে কিংবা মেনে নেওয়ায়,
(গৃহপালিত করে তুলতে হয় হৃদয় আর পরিধান করতে হয় সহ্য)
আর সম্ভবত গড়ে তোলা যায় আমার ঘুরে বেড়ানোর এক ভাবমূর্তি,
এক ছোট্ট প্রতিমা— পথের ধারের মন্দিরে— রাহীদের কাছে নিদর্শনের মতো—
এই উপবনে আমি অতন্দ্র জীবিত আর এই ই আমার গৃহ।
সর্বজনীন সম্ভাষণসমূহ
দাঁড়াও সরকারের প্রতিপক্ষে, তোমার ঈশ্বরের বিপরীতে,
হয়ে ওঠো দায়িত্ববোধহীন।
উচ্চারণ করো শুধু সেইটুকু যা আমরা জানি আর ধারণা করি।
স্বয়ম্ভুরা নিগ্রহপরায়ণ,
পরিবর্তন একমাত্র অসীম।
সাধারণ বুদ্ধি ধারণ করে নিত্য বিভাব।
প্রতিপালন করো যা অবিস্মরণীয়,
ঘোষণা করো যা তুমি গ্রাহ্য করছ,
লুফে নাও চিন্তারত তোমার মননকে,
অত্যুৎজ্জ্বলেরা স্বয়ং নির্বাচিত।
যদি আমরা কাউকে প্রকাশ নাও করতে পারি,
আমরা তো মুক্ত যা প্রাণে আসে তা লিখতে।
স্মরণে রাখো ভবিষ্যৎকে,
আমেরিকা মহাদেশে নাগরিক সম্মানের দাম কানাকড়ি।
মন্ত্রণা শুধু নিজেকেই দিতে পারি,
নিজের মৃত্যুকে পানীয় করে ফেলো না নিজের,
দুই অণু যখন পরস্পরের ঝন আওয়াজে সচকিত করে আমাদের,
তারও একজন পর্যবেক্ষক প্রয়োজন হয়
বৈজ্ঞানিক তথ্যের স্বীকৃতি পেতে।
পরিমাপের সূচকেরা নির্ধারণ করে দেয়
বিস্ময়কর পৃথিবীর আবির্ভাব।
(আইনস্টাইনের পরবর্তী সময়ে)
এই বিশ্ব আত্মবাদী।
হুইটম্যান উদযাপন করেছিলেন মানবতা।
আমরা দর্শকমাত্র, পরিমাপের সূচক, চোখ, বিষয়, ব্যক্তি।
এই মহাবিশ্ব আদি মানব।
আভ্যন্তরীণ মস্তিষ্ক বাহ্যিক করোটির মতোই বিস্তৃত।
চিন্তাশক্তির মধ্যবর্তী স্তরে কী?
এই চৈতন্য মহাশূন্য।
নিঃশব্দে, আমরা রাতের শয্যায় নিজেদের কী বলি?
“যা প্রথম উপলব্ধি, তাই শ্রেষ্ঠতম”।
বোধ সুষম, শিল্প সুগঠিত,
সর্বোচ্চ তথ্য, সর্বনিম্ন সংখ্যক অক্ষর,
ঘনীভূত অন্বয়, নিরেট ধ্বনি,
উচ্চারিত বাগধারার তীব্র বিচ্ছিন্ন অংশেরাই বিশিষ্ট।
ছন্দে এগোনো, স্বরবর্ণের আবর্তন,
স্বরকে ঘিরে থাকা হলবর্ণদের বোধগম্যতা।
স্বাদু হয় স্বরধ্বনি, মূল্যবৃদ্ধি ঘটে ব্যঞ্জনবর্ণদের,
শুধু তার দৃষ্টিসাপেক্ষে বিষয় জ্ঞাতব্য হয়,
বাকিরা তো দৃশ্যের পরিমাপ করে যা আমরা দেখি, তার ভিত্তিতে,
সরলতা হয়ে ওঠে মস্তিষ্কবিকৃতির হন্তারক।
কাব্য
এই পৃথিবীর ভার হল প্রেম,
একাকিত্বের চাপের নীচে,
অসন্তোষের বোঝার নীচে,
যে পাষাণ,
যে দায় আমরা বয়ে নিয়ে চলি,
তা প্রেম।
কে অস্বীকার করতে পারে?
স্বপ্নে প্রেম শরীর স্পর্শ করে,
চিন্তায় অলৌকিকের নির্মাণ ঘটায়,
জন্মইস্তক কল্পনায় মানুষকে পীড়ন করে চলে,
হৃদয় পেরিয়েও,
দাহ্য সে হয়েই চলে শুদ্ধি অর্জনে,
কারণ জীবনের দায়িত্ব প্রেম।
কিন্তু আমরা এই ভার পৌঁছে দি ক্লান্তিকরভাবে,
তাই বিশ্রাম নিতেই হয়,
ভালোবাসার ভুজে পরিশেষে,
বিশ্রাম নিতেই হয়,
প্রেমের হাতে সমর্পণে।
প্রেম ব্যতিরেকে নেই কোনও নিশ্চলতা,
প্রেমের স্বপ্ন ব্যতীত আছে যাবতীয় নিদ্রাহীনতা,
উন্মাদ হও বা সুশীতল,
দেবদূতদের নিয়ে অন্ধকার আবৃত থাকো বা নিছক যন্ত্র,
অন্তিম আকাঙ্ক্ষা প্রেম।
নির্মম হওয়া যায় না,
না যায় সত্যকে অস্বীকার করা,
প্রতিসংহারের উপায় থাকে না,
যদি প্রেম প্রত্যাখ্যাত হয়।
এ গুরুভার অতি দুর্বহ।
বিনিময়ে আসবে না কিছুই,
জেনেও দিয়ে যেতে হবে,
কারণ একান্তে বোধের অঞ্জলি কবেই সম্পূর্ণ,
গৌরবের সমস্ত সীমাকে লঙ্ঘন করে।
উত্তপ্ত শরীরদ্বয় যৌথতায় উদ্ভাসিত হয়,
অন্ধকারে, হাত পৌঁছতে চায় স্থূল দেহের কেন্দ্রে,
প্রশান্তিতে ত্বকের স্ফূরণ আসে অনাবিল,
আর আত্মা আনন্দময় হয়ে আবির্ভূত হয় চোখে।
এই সেই, এই ই তো সেই,
যা আমার অভিপ্রায়,
আমি সর্বদা প্রার্থনা করেছি,
আমি নিত্য কামনা রেখেছি,
প্রত্যাবর্তন করতে,
সেই শরীরে,
যেখানে আমি জন্মেছিলাম।
উন্মত্ত এতিম
রেলপথ আর নদীর ধারে,
বিনীতভাবে মা তাকে নিয়ে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে।
সে এক পলাতক, ক্ষমতাবান দেবদূত পুত্র।
আর তার কল্পনায় অনেক গাড়ি,
স্বপ্নে সে তাদের সবার সওয়ারী।
অবাস্তব মোটরগাড়ি,
আর মৃত, কলঙ্কিত মফস্বলের জীবাত্মাদের মধ্যে
এই উদ্ভিন্ন হয়ে ওঠা কি অসম্ভব নির্জন।
কি অসম্ভব একাকী,
শুধুমাত্র কল্পনায় ভর দিয়ে সৃষ্টি করা যে তার আরণ্যকের সৌন্দর্য নিছক পূর্বপুরুষের পুরাণ,
যা সে উত্তরাধিকার সূত্রে পায়নি।
পরবর্তীতে যখন সে স্মৃতির অপ্রকৃতিস্থ রশ্মিতে,
প্রহেলিকার মধ্যে থেকে জেগে উঠবে,
সে কি অলীক ঈশ্বরের অস্তিতে বিশ্বাস লালন করবে?
স্বীকৃতি,
তার অহং সাপেক্ষে যা অতি দুষ্প্রাপ্য,
তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে শুধু স্বপ্নে,
তার অতীত আর্তি,
শুধুই অপর কোনও জন্মের।
স্বত্বের একটি প্রশ্নে,
আহত তার আঘাত হারিয়েছে সরলতায়,
একটি লিঙ্গ, একটি বধকাষ্ঠ,
প্রেমের একটি পরম কৃতিত্ব।
আর পিতাটি,
মেধার জটিলতায়,
ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরে শোক পালনে রত।
অপ্রত্যাশিত এই প্রসঙ্গে সে অজ্ঞাত,
এক হাজার মাইল দূরত্ব থেকে,
প্রাণোচ্ছ্বল নবজাতকটি,
খিড়কি দুয়োরের দিকে এগোচ্ছে।
সিলভিয়া প্লাথ-এর কবিতা
সোনালী চক্রবর্তী
আন্তর্জাতিক সাহিত্যের ইতিহাসে যে নক্ষত্র তাঁর বিষাদের দ্যুতিতে চিরব্যাতিক্রমী, তিনি সিলভিয়া প্লাথ। ভাবতে বিস্ময় জাগে, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির বিদুষী, ১৯৩২ সালে জন্ম নেওয়া আমেরিকান সুন্দরী সিলভিয়া কী গভীর বিষাদে মাত্র ৩১ বছরের জীবদ্দশায় রচনা করেছিলেন “The Colossus and Other Poems”, “Ariel”, “Lady Lazarus” এবং প্রায় আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস “The Bell Jar” যা তার আত্মহননের সামান্য কিছু আগে প্রকাশিত হয়। প্রায় নিয়মিতভাবে তাঁর বিষাদের উপশমে মনোবিদরা প্রয়োগ করতেন ইলেকট্রিক শক। সবাইকে ব্যর্থ করে জ্বলন্ত ওভেনে মাথা ঢুকিয়ে ফ্রিডা আর নিকোলাসের মা, কবি টেড হিউজের স্ত্রী, ওটো আর অরেলিয়ার সন্তান সিলভিয়া জীবনের মতো মৃত্যুতেও তার শেষ কবিতা খুঁজে নেন। তিনিই সূচনা করেছিলেন ‘Confessional Poetry’ নামের লিটারারি মুভমেন্টের। ১৯৫৫ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে পেয়েছিলেন ‘Glascock Prize’ আর ১৯৮২ সালে মরণোত্তর ‘Pulitzer Prize for Poetry’।
সিলভিয়া প্লাথের কবিতা
সিন্ডারেলা
আরক্তিম রেকাবের মেয়েটির উপর রাজপুরুষটি ঝুঁকে থাকে,
যখন তালের সম কিছুটা মন্দ হয়ে আসে আর উল্টে যাওয়া বেহালায় ঘূর্ণিরা প্রসারিত হতে থাকে,
মেয়েটির সবুজ চোখ চমকে ওঠে,
রুপোর পাতের মতো চুলগুলো ফ্যানের হাওয়ায় ঝলসায়।
সুউচ্চ কাঁচ প্রাসাদের ঘরটিতে সবকিছুরই যেন অবিরাম পুনরাবৃত্তি,
যেখানে অতিথিরা মসৃণ আলোয় পিছলে যায় মহার্ঘ্য সুরার মতো,
ফুলেল বেগুনি দেওয়ালে গোলাপ সুগন্ধি মোমেরা ঝিকিয়ে প্রতিফলিত করে
লক্ষ লক্ষ বিপুলাকৃতি বোতলের উজ্জ্বলতা।
স্বর্ণখোদিত মিথুনেরা যেন এক ঘূর্ণন সম্মোহনে
অনুসরণ করে চলে সুদূর অতীতে শুরু হওয়া ছুটির দিনের আমোদ প্রমোদ,
যতক্ষণ না কাঁটা বারোটার কাছাকাছি পৌঁছায় আর আজব মেয়েটি হঠাত করে বিরতি নেয় অপরাধের অবদমন রুখতে,
ফ্যাকাশে হয়ে যায়,
আঁকড়ে ধরে তার রাজপুত্তুরকে।
কারণ,
বিভ্রান্তিকর সঙ্গীত আর মন্থিত পানীয়ের ভিতরে মেয়েটি অনিবার্য শুনতে পায়
দেওয়াল ঘড়ির মর্মান্তিক টিকটিকানি।
এক অভ্যুদয় বিশেষ…
রেফ্রিজারেটরদের মৃদু হাসি আমায় সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেয়,
আমার প্রেমিকাটির শোণিত শিরায় এমনই অশ্লীল বিদ্যুৎপ্রবাহ,
আমি শুনতে পাই তার বিশাল হৃদয়ের গরগর আওয়াজ।
তার ঠোঁট থেকে প্রতি মুহূর্তে আর শতাংশে চুম্বনের মতো সঙ্কেতের নিষ্ক্রমণ হয়,
তার প্রবৃত্তিতে কি সপ্তাহের সূচনা এখন? নীতিশাস্ত্র?
সাফাইয়ের পর ইস্ত্রি করে নিজেদের উপগত করা,
এই স্ববিরোধিতায় আমার করণীয় কি?
আমি পরিধান করি সফেদ হাতকড়া আর নুয়ে পড়ি।
এই কি তাহলে প্রেম? এই রক্তাভ বাস্তব?
ইস্পাতের সূঁচ থেকে উৎসারিত হয়ে যা কানামাছি হয়ে যায়?
এটি তো ছোট্ট ছোট্ট পোষাক আর আচ্ছাদনের নির্মাণকারী।
এটি রক্ষা করে একটি সাম্রাজ্যকে,
কীভাবে তার দেহ আবৃত আর অনাবৃত হয়,
একটি শৌখিন দুর্মূল্য হাতঘড়ি,
প্রতিটি কবজাই রত্নখচিত।
হৃদয় আমার… এ তো অরাজকতা,
নক্ষত্রেরা ঝলসাচ্ছে যেন করাল সংখ্যাসমূহ,
আর তার চোখের পাতারা গতের নামতা পড়ছে।
স্বকামিনীর অন্তর্জগতে…
প্রাণবন্ত, প্যাঁচানো, পরিণত-অতিক্রান্ত দুরত্বের খণ্ডগুলি যেমন,
নাবিকের মোটা খসখসে ওভারকোটের মধ্যে, স্বকামনার অভ্যন্তরে, পার্সি বশ্যতা স্বীকার করে,
ফুসফুসের কিছু থেকে পুরুষটি তখন ক্রমশ আরোগ্যলাভের দিকে।
স্বকামগুলিও অবনত হতে থাকে বৃহৎ কিছুতে,
তারা বিহ্বল করতে থাকে সবুজ উপত্যকার উপর তার নক্ষত্রগুলিকে যেখানে পার্সি
সূঁচের ফোড়ের তকলিফকে পরিচর্যা করে আর হাঁটতে থাকে, হাঁটতেই থাকে।
বিষয়টিতে একটি সম্ভ্রম রয়েছে, একটি নিয়মানুগত্য,
ফুলগুলি পটির মতো তীব্র আর পুরুষটি সংস্কারে রত,
তারা আনত হয় আর টিঁকে থাকে,
তারা বরদাস্ত করে আকস্মিক আক্রমণ।
অশীতিপরটি ভালবাসে ক্ষুদ্র যূথগুলিকে,
সে যথেষ্ট অভিজাত,
নিদারুণ হাওয়া তাকে শ্বাসের চেষ্টা দেয়,
স্বকামিনীটি চোখ তুলে তাকায় যেমত শিশু,
রক্তশূন্য দ্রুততায়।
মৃত্যু এবং আসঙ্গ
দুজন, অবশ্যই তারা ‘দুই’জন পুরুষ,
এটা এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিকই ঠেকে,
প্রথমজন কখনও চোখ তুলে তাকায় না,
তার চোখগুলো ঢাকনাওয়ালা, ব্লেকের পাঁচালির মতো,
সে প্রদর্শনীতে বিশ্বাসী।
বণিকী মালিকানার সুপরিচিত সিলের মতো হয়ে গেছে তার জন্মদাগগুলো,
বাষ্প প্রদাহের ক্ষতচিহ্ন,
নগ্নতা,
শকুনির তাম্রমল,
আমি রক্তাভ মাংসখণ্ড, তার খাঁড়ার মতো নাক।
পাশে পড়ে থাকে হাততালির শব্দ,
আমি এখনও তার অধিগত হইনি।
সে আমায় বলে স্থিরচিত্রে আমি কতটা কদাকার,
ভীষণ স্বাভাবিকভাবে সে বলতে থাকে হাসপাতালের বরফ বাক্সে শোয়ানো শিশুগুলি কত মধুর।
ঘাড়ের কাছে ঝালর,
তারপর আদিম উপত্যকার বাঁশি,
মৃত্যুর আলখাল্লারা
আর ছোট্ট দুটো পা
সে হাসে না, ধূমপানও করে না।
অপরজন সেগুলো করে,
তার চুল দীর্ঘ কিন্তু আদতে নকল,
বেজন্মা
একটা ঝলকানিকে নিয়ে স্বমেহনে মেতে থাকে,
তাকে ভালোবাসা হোক, এটা তার চাহিদা।
আমি উত্তেজিত হই না,
ব্যর্থতা একটি ফুলের নির্মাণ করে,
হিম তৈরি করে একটা নক্ষত্র,
মৃত্যু ঘণ্টাটি,
মৃত ঘণ্টাটি,
কেউ তার কাজ শেষ করে ফেলেছে।
আমি শীর্ষদেশীয়
কিন্তু আমার হওয়ার কথা ছিল সমতল,
মাটির গভীরে শিকড় ছড়ানো কোনও বৃক্ষ আমি নই
যে প্রতিনিয়ত খনিজ ও মাতৃপ্রেমের স্তন্য পান করে
যাতে প্রতি বসন্তে আমার সমস্ত রশ্মি পাতায় বিকিরিত হয়।
মুগ্ধতায় নিজের অংশকে প্রলুদ্ধ করা, দর্শনীয়ভাবে চিত্রিত
কোন লাবণীও আমি নই
যে উদ্যান শয্যাকে খোলতাই করে।
জানতে পারার আগেই খুব দ্রুত আমার পাঁপড়িদের ছিঁড়ে ফেলা হবে।
আমার সঙ্গে তুলনায়, একটি বৃক্ষ অবিনশ্বর
আর একটি গর্ভমুণ্ড, নাতিদীর্ঘ কিন্তু অধিক বিস্ময়কর।
আমি একটির পরমায়ু কামনা করি এবং অপরটির স্পর্ধা।
আজ রাতে, নক্ষত্রদের অতি সামান্য আলোয়,
বৃক্ষ আর ফুলেরা তাদের শীতল ঘ্রাণ ছড়িয়ে চলেছে।
আমি তাদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছি,
কিন্তু তারা কেউ আমায় লক্ষ করছে না।
কোনও কোনও সময় আমার মনে হয়,
যখন আমি ঘুমিয়ে থাকি,
আমি অবশ্যই সবচেয়ে নিখুঁতভাবে তাদের মতো হয়ে উঠি।
চিন্তাগুলো ক্ষীণ হয়ে আসে।
আমার জন্য সবচেয়ে প্রকৃতিসম্মত হল শুয়ে পড়া,
তখন আমি আর আকাশ মুখোমুখি আসতে পারি মুক্ত সংলাপে।
আর আমি অবশ্যই বেশ ব্যবহার্য হয়ে উঠব যখন চূড়ান্তভাবে শুয়েই পড়ব।
তখন হয়তো বৃক্ষেরা একবারের জন্য হলেও আমায় স্পর্শ করবে,
আর ফুলেদের কাছে সময় থাকবে আমায় দেওয়ার জন্য।
ব্রতকথা
যেদিন জন্মেছিলাম
আকাশ ভাঙা প্লাবনের মতো
আমার দাদুর বাড়ির উঠোন জুড়েও
রূপ আর সৌভাগ্যের বান ডেকেছিল ।
পরে এসব উপকথা
শুনেছি...
যার রূপকথা শোনাতে
অধুনা অলীক সেই গোষ্ঠীরই কাছে
পরবর্তী ইতিহাস শুধুই পাঁচালি...
আজ...
প্রাসাদ নগরীর পশটাওয়ারের পুলে শুয়ে
প্রতি মাঝরাতে
জলে মদ আর মদে জলের মিশ্রণ অবান্তর হয়ে গেলে
নোনতা জলটাই বেশ মিষ্টি লাগে জিভে...
ওই নীচে, পিঁপড়ের মতো, ধুলোর উপর, মাঘের শীতে ঘুমোনি
অরক্ষিত
বাচ্চাটার মুখে আমি আয়না দেখি ।
আর লুব্ধক লুব্ধ চোখে তাকিয়ে বলে দেয়...
লক্ষ্মী বলে যারা ডেকে গেছে,
তারা বোঝেইনি
আমি এক ছিন্নমস্তা...
রুধির পান করতে করতে
সমৃদ্ধির দান ছড়াতে ছড়াতে
আমার আর কুমোরপাড়ার গলিটায়
পৌঁছোনোই হয়নি কোনও দিন
যেখানে অসমাপ্ত অদ্রিজা দেখে
মহালয়ার রাতে
সাজের নাতিকে ধমকে শিল্পী দাদু বলেন
ওরে... মায়ের মাথাটা লাগা... মাথা...
রসায়ন
আজ ব্যবহারিক রসায়নের একটা বই
নেযে চেড়ে দেখছিলাম...
পূর্ণমান একের পর এক প্রশ্নের উত্তরে
কোন এক অধ্যায়ের নীচে সেখানে লেখা ছিল
'যাতে লাফিয়ে না ওঠে
স্ফূটনাঙ্ক নির্ণয়ের সময়
তরল পদার্থে পোর্সিলিনের টুকরো
তাই যোগ করা হয়'
ভেসে বেড়ানো বাষ্পীয় মন চিন্তাতরলে নিমজ্জিত মন
কত অনুভূতিরা দাবি করতে লাগল
মৌলিক আর যৌগিকের সম্মান
স্মৃতিরা উত্তাপ দিল প্রচুর
স্ফূটনাঙ্ক নির্ণয় হল না ঠিকই
তবে তুমি যে পোর্সিলিন ছিলে
অভ্রান্ত প্রমাণ কিন্তু সময় রেখে গেল ।
Sunday, November 7, 2021
প্যালিনড্রোম
"প্যালিনড্রোম
যেভাবে প্রতিটা একলা মানুষ অধিকতর একলা হ’তে চেয়ে দীর্ঘ কোনো মিছিলে হাঁটে, আমিও গুছিয়ে রাখি একান্তের উজ্জ্বল খুঁটিনাটি, ভাঙা আদর, রঙিন জোড়াতালি, নেশার ধূসর কৌতুক কিছু আর প্যালিনড্রোমীয় স্মৃতি। সন্ধ্যা নামলে সালতির কুপিগুলি স্থলের কঠিন থেকে সলতে বোধ হয়, কত যে ফল্গুর এখনো পোড়া বাকি...ভাবো তো, আবর্তন ব’লে আদৌ কিছু হয় কি? যে-কাশের দেউলে তুমি গাত্রহরিদ্রা এঁকেছিলে, গেল পূর্ণিমায় তা ময়ূর মুছে লবণ হয়ে গেছে, যে-চ্যুতি থেকে শিশু অশ্বত্থ আলোর হামা টানছিল, এখন হোম স্টে-য় পরিত্যক্ত বীর্যের চাষ করে। অথচ শূন্য আর দুই নিয়ে আজ একের যত হাড়হাভাতেগিরি। আয়নাকে হরবোলা মনে ক’রে আমি খুলে রেখেছি আঙুলের চামড়া থেকে নখরা, গ্রীবা থেকে হাঁস, পিঠ থেকে রডোডেন্ড্রন, সবই...স্মৃতি ফিরে এলে জৈন চন্দ্রাতপটিতে খুঁজো, যক্ষেরা দূত হয়, দাস হবে না ভেবে সিসিফাস যক্ষীরা বয়ে যায় জন্ম-জন্মান্তর ধ’রে ঝলসানো মাটির দায়।"
যৌতুক এবং সারভাইভাল ইন দ্য সেকেণ্ড
যৌতুক
প্রতিটা মেয়ের ছায়াতেই একটা করে ভাঙা বাতিঘর দেখতে দেখতে পুরো নাভিজন্মটা পেরিয়ে চলেছি অথচ কেউ আমায় উদ্ভিদ সনাক্ত করে উপড়ে দেওয়ার প্রয়োজন বুঝছে না। সিঁদুরে মেঘ কখন সহজিয়া পথ খুঁজে নিয়ে দেউলিয়া হতে চাইছে সামান্য জলের অজুহাতে, পারদের উপর কোনো আলো সেই প্রতিবিম্বের ঠিকানা চাইছে না। অর্জন ভাবতে বসলে মনে হয় কেন যে ডানা পুড়িয়ে পুড়িয়ে সামান্য কিছু হীরে খোঁজা হলো, এতো জানাই ছিলো আমার শ্যাওলার সেতার, যত নিপুণ ছড় ততই গর্ভস্থ মাটিতে বেহুদা জেগে থাকা কবরে ফুটে উঠবে প্রলাপ-এ-পারিজাত।
সারভাইভ্যল ইন দ্যা সেকেন্ড
বিষণ্ণ সিঁথিদের ঘিরে অসুস্থ জ্যোৎস্নার পরিক্রমা বিলাস দেখতে দেখতে ক্লান্ত হচ্ছি আমি। সময়কে নদী বলেই তো ডাকে মানুষেরা, ইদানীং তার জলেদের কাছে প্রতিটা সূর্য আলোর নামে একমুঠো করে বালি বয়ে আনে, চর দীর্ঘায়ুকামী। যদিও আক্ষেপের মানে ভাঙা বাঁশিতে ছিদ্র গোনা তবু মনে হয়, এত যে ভুলে যাই জনমভোর, প্রায় সব একদা প্রিয় কিছু, কেন শ্বাস নেওয়া মনে রেখে রেখে আয়ুকে ক্লান্তির অবসর দিয়ে যেতে হলো?