Sunday, November 7, 2021

সিরিজ : অসাধু অতি আবেগী আলাপ

 

ত্যাগ

নগরীতে দুন্দুভি বাজে নববর্ষ প্রাতে,
ঘোষনা ভেসে আসে,ঘোষনা…
রাজকবি সাক্ষী মানিতেছেন জনার্দনকে।
পতিত হইয়াছিলাম,
‘নারী নরকস্য দ্বার’ বিস্মরণে,
উপরন্তু সে ছিলো পতিতা।
উদ্ধার কর আমায় হে স্বজাতিবর্গ,
এই নগর হইতে নির্বাসনে।
এরপর পার হইল একশতটি দিন,
মূর্খ কলঙ্কিনী পত্র দিলো পুনরায়,
জীবনের নেশা বিষম অতি,বেহায়া লোলুপ।
হৃদয় বিচলিত হয় মাদ্ধীপানে,
কবিও ঈষৎ বিব্রত পুর্ব স্মৃতি বিজারণে ।
অবসর মিলিল না কবুতর প্রেরণে,
সভাসদ,উৎসব তথা সময়াভাবে।
রাত্রি পর রাত্রি কাটিলো বৃথা পথ সন্দর্শনে,
অপেক্ষায় নিভিলো দীপ,
কে কাহার এই ভুবনে?
সপ্তডিঙি অভিমুখে যাত্রা আজ কবির,
বিদেশ যাইতেছেন সাম্মানিক আমন্ত্রণে।
কে ভাসিয়া যায় তটরেখা ধরে,
যেন পরিচিত অবয়ব অতি।
সনাক্তের উপায় রহিত,
ফুলিয়াছে জলধর্মে,পচন শরীরে, যেমত বিধি।
দৃষ্টি ফেরান কবি,
সাঙ্গ হইলে শ্বাস,
ছিঁড়িলে প্রণয় পাশ,
কে মনে রাখে,
কে ছিলো প্রেমিকা আর কে নগর নটী।

মেঘদূত

শেষ পাপ অস্তমিত হলে দীর্ঘ রাজপথ কিছু ক্ষত চিন্হ পোষে।
কত উৎসব বহিতেছে এ নগরীতে প্রত্যহ,
অথচ, উপড়ানো কাঁটার প্রান্তগুলিকেই অলিন্দ তার স্বস্তয়নে খোঁজে।
এই অযাচিত ন্যাকামি কে বহিবে বলো ?
যার ভূমে রক্ত মাদল থাকে,সময়ে
সেও নেয় ঠাঁই জন সমর্থনে,
কার্টসি: বিপ্লব ও সরকার।
এই পোড়া দেশে,গণতান্ত্রিক মোহে,
এক উন্মাদ অপেক্ষা ধন-ধান্যে বসুন্ধরা সমূহ দরকার।
এই বৎসর সমতলে,
মধ্য আষাঢ়েও প্রসব লক্ষণ নাই,
কোন এক গর্ভিণী কাছিম ধীরে,
অতি ধীরে মেঘ দর্শনকালে,
ফসিল হয়েছে দ্রুত,
লাভাস্রোতকে ভ্রমে নদী কল্পনায়।

বহু কথা হইল অত্র,
অগ্রদাণির সন্ধান মিলিল না।
যক্ষ যে অনন্তর বধ হইয়াছিলো,
কাব্যস্বার্থে গোপন রাখা থাকে,
সে প্রসঙ্গের অবতারণা।

ভবিতব্য

বামনিতে আদৌ আর স্রোত নামিবে কি?
শোনা যায়,অপূর্ণ মিলনের অভিশাপ নদী বিস্মৃত হয় নাই কোন কালে।
গো ক্ষুরের আলোয় নিয়ত সর্প ও বিষ লইয়া তুমুল তর্ক ঝড় ওঠে, উত্তরে তুলসী মঞ্চের অন্ধকার হইতে ভগ্ন শাঁখের বিদ্রুপ ভেসে আসে।
কাকে সাক্ষী মানিবে ময়ূরের পালকগুলি?
অথবা পরবর্তী চন্দ্র দর্শনের প্রতীক্ষায় যে জলাধারটি?
উহারা দ্বেষ-আক্রোশ বিষয়ে অবগত নহে,
উহাদের পাঠ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ নাই।
সফলের জয়ধ্বজা মায়াবৃত্তে অবরুদ্ধ হয় না,
দৈবী অহংও নতজানু হয়না জাগতিক প্রলাপে।
পরাজিত হয় শুধু নক্ষত্ররাজি,
আর এই মৃত্তিকার দীর্ঘশ্বাসগুলি।
মানবের ইতিহাস শুধু ছিন্নমস্তার পাঁচালি পড়ে…

সোনালী চক্রবর্তী
সোনালী চক্রবর্তী

সোনালী চক্রবর্তী। কবি, অনুবাদক ও সম্পাদক। জন্ম ভারতের বারাণসীর পীতাম্বর পুরায় আশির দশকের শেষ ভাগের মাঘী পূর্ণিমায়, সুনীল চন্দ্র চক্রবর্তী ও সবিতা চক্রবর্তীর একমাত্র সন্তান। বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি, দার্জিলিং ও কার্শিয়াং মিলিয়ে। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ২০১৬ সালের...


ব্রিগেড, শহীদ ইত্যাদি সার্কাস

 

নীতাদের কথা

তুমি ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখেছো?
শেষ দৃশ্য?
আমি পুনরাধুনিক কা কথা,
তিন পুরুষ আগে ছেড়ে আসা মাটির অর্ধ-সত্য গন্ধে,
পানকৌড়ি যাপন পেরোতে পেরোতে,
এখনও অস্কারের পাঠেই পৌঁছাইনি,
সাদা-কালো পর্দার ঋতুতে শিল্পের যজ্ঞ মানে আমার কাছে আজও ঋত্বিকবাবু।
আচ্ছা, শোনো,
আমি এখন ভালো মেয়ে হয়ে গেছি,
‘সেফ’ যাকে বলো তোমরা।
জেহাদি আগুন চোখ,প্রতিবাদ দম্ভের তোপ,
এসব তো সাংসারিক অশ্লীলতা।
লক্ষী মেয়েরা হবে
শীতলপাটির পাশে ঘটি চাপা দেওয়া,
শান্ত লাল ভাঁজে ভেজা গামছাটি যেন।
জন্মের উদ্দেশ্য,
অতিরিক্ত জলজ বিষয় বুকে শুষে নেওয়া।
ভার্জিনিয়ার সুরে চিৎকার চলবেনা,
“এন্ড গিভিং গিভিং গিভিং,আই আম ডায়েড”,
শতচ্ছিন্ন হয়ে কখন হারিয়ে যাবে,
কোন এপিটাফ আসবে না।
অথচ উপাদানে ধাতু থাকে কিছুজনের,
মস্তিস্কে মেধা,
সামান্য উত্তাপে সংঘর্ষের ধর্ম থাকে,
নাহলেও বিষাদ প্রবণতা।
তার চেয়ে ভালো বরং,
নি:শর্ত আত্মসমর্পণ।
কীসের প্রতিরোধ?
যুদ্ধ বলে কী হয় আসলে?
ঐন্দ্রজালিক পদ্ধতিতে সভ্যতার ভারসাম্য রক্ষা।
পরিণাম নির্ধারিত না থাকলে,
খেলা শুরুর সঙ্কেত কোন এরেনাতেই বাজেনা।

ব্রিগেড,শহীদ ইত্যাদি সার্কাস

কোনও কণ্ঠই জানেনা শ্লোগানের আড়ালের খেলা অন্য ময়দানে হয়, ফলত: কেউ অমর উদ্ধৃতি আর কেউ অকারণ ফিসফাস। এই মুহুর্তের গাড়িচাপায় যে লোকটি মৃত শুয়ে দেখছে রাজপথ ও রবিবার, তার রক্ত আর ঘিলুর পাশে সদ্যকেনা জীবন্ত শাকসব্জিতে উজ্জ্বল রোদ্দুরের বিলাস। বিলীন অবধি যে কোন সৃষ্টির অস্তিত্ব এরকমই হাস্যকর ভ্রম। মরণ লগ্নে ঝুপ করে ধ্বসে পড়ার আগে নদী আর মাটির সংসারে দীর্ঘ ফাটলের বংশবিস্তার। ভালোবাসা বোঝে তার মায়ার ভবিতব্য অসহ্য শৃঙ্ক্ষল আকাশের পায়? কবিতা বোঝে নির্দিষ্ট সময়ের পর কীভাবে প্রতি কবির কালির রঙ বদলে যায়? কেউ কিছু বোঝেনা মুছে যাওয়ার আগে। উড়ন্ত কাকের সংখ্যা জানায় মফস্বলের কষে শহুরে গ্যঁজলার সাম্রাজ্যবাদ। প্রতিটি গুপ্তহত্যা সাময়িক গুজব, বিনোদনের ঠোঙায় বাসি বিবাদ-বিসম্বাদ।

সোনালী চক্রবর্তী
সোনালী চক্রবর্তী

সোনালী চক্রবর্তী। কবি, অনুবাদক ও সম্পাদক। জন্ম ভারতের বারাণসীর পীতাম্বর পুরায় আশির দশকের শেষ ভাগের মাঘী পূর্ণিমায়, সুনীল চন্দ্র চক্রবর্তী ও সবিতা চক্রবর্তীর একমাত্র সন্তান। বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি, দার্জিলিং ও কার্শিয়াং মিলিয়ে। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ২০১৬ সালের...


কবিতাগুচ্ছ

 

পাঁজর 

 

তুমি আমায় অজুহাত শব্দের বানান শেখাও,

আর আমি মহালয়ার ভোরে খুঁজি বিষণ্ণতা বার্ষিকী।

জমে থাকা কুয়াশায় টুরিষ্ট জুতো,

ইয়াবার মেঘে ক্রমশ একা থেকে একা।

অভিমান চিরদিন নিথর অজগর,

গিলে বসে থাকে যাবতীয় সত্যের শ্বাস।

তোমার গভীর নির্লিপ্তি থেকে ঝিকিয়ে ওঠা

নীল আঘাতেরা মনে পড়ায় দুর্বাসার তপশ্চর্যা,

তবুও কি ভীষণ মোহে আমার দিনাতিপাত…

আমি জানি,

ইভেরা এভাবেই মেনে নেয়,

পাঁজর নির্ভরতার ধারাপাত।

 

লীলা

 

নিবিড় ক্ষরণ নি:শব্দে অন্তের পর

গহীন হও তুমি,

উতরোল সোহাগে স্নাত ব্যথাদের,

অবগুন্ঠন খোলো ত্রাতার মসীহায়,

ক্ষতস্থান আমার অনাঘ্রাত নববধূ,

 

কে জানতো?

‘লবণ’ তোমার প্রিয় বিলাস।

 

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলায় প্রকাশিত সমস্ত কবিতার জন্য ক্লিক করুন এখানে

 

মুর্খের শুভঙ্করী

 

আবছায়া হ্যালোজেনে ঠাহর খোঁজা চোখ,

‘ফিরলো সে?’

কোনও কোনও দিন মুহূর্তেরা অতিরিক্ত দীর্ঘ,

ধমনীতে স্পন্দন হঠাৎ দ্রুত,

‘আহা,আজ বড় শ্রান্ত’,

শুষে নিতে ইচ্ছে করে একশো বছরের প্রতীক্ষা

পলকের সম্মোহনে,

দুর্ভিক্ষ দৃষ্টিতে শান্তিবারি ঝরে

দিনান্তের সন্দর্শনে……

 

এই সবই ঠাস বুনোট হ্যান্ডলুম,

ফ্যন্টাসির ছায়াবাজি।

 

বাস্তব, সহ্যাদ্রির অধিক সহ্যশীল,

এখানে উন্মুক্ত অন্তর্জাল,

অবরোধহীন সংযোগসূত্রেরা পড়ে থাকে

পরিত্যক্ত কারশেডে,

ক্রমে নির্জন প্রেতপুরী।

‘ব্যথা খুব?’

এ জিজ্ঞাসা আপেক্ষিক,

দাসচুক্তির উলঙ্ঘনে আশঙ্কাদের অন্তর্ধান,

পরিচিত অভ্যাস।

আটান্ন ঢেউ এর ফেনায় অনার্দ্র থেকে যাওয়া,

লবণপীড়িত মহুলমাস……

 

পরিব্রাজন আদতেই সৎ ও স্মৃতিহীন প্রতারণা,

আধার সাপেক্ষে বদলে নেওয়া

মৌলিক চাহিদা,

‘মায়া’ শব্দের কল্প দায়ভার….

 

শ্বাস বৈকুণ্ঠগামী

 

কার্শিয়াঙের লাল কার্ডিগান আর রডোডেনড্রন,

অদ্ভুত ধন্ধে ফেলে এই বৈকুণ্ঠগামী তন্দ্রায়,

আসলে কি কোনোদিন ঘটেছিল এসব?

প্রদর্শকহীন পথে হেঁটে প্রথম শ্রেণী,

শুধুই ন্যাপথলিন ফাইলের টুরিষ্ট?

এ পৃথিবীতটে কবিতার বসন্ত উৎসবে,

যে প্রেমিক সম্রাটের নাম ভূমিকায়,

তার আলোকদশায় কোনোদিন প্রার্থনা

ছিলোনা কাণ্ডারির বালু সেতু বন্ধনের তবে?

ক্লিওপেট্রা মনে পড়ে।

সম্পাদনা,সৃষ্টিতত্ব নিছক ম্যানমেড বিলিফ।

সাড়ে চুয়াত্তর পৃথিবীর চোখে,

একা শিরদাঁড়ার যোনি শুধুই কলঙ্ক প্রসবিনী,

বৃষ্টি দুপুরে,প্রখর চাঁদে কখনো তাদের আত্মা কাঁদেনি।

অধিকারে নেই অভিমান,

শুধু বৃদ্ধ সাধু সঙ্গিনী।

 

পুরুষ কোনোদিন মানুষ হয়না এই নশ্বরতায়,

ফেলানির কাঁটাতার ঈদ দেখেছিল,

নষ্ট না হলে বুড়ি চাঁদকে জীবনানন্দও ছোঁয়নি।

 

পূর্ব রাত 

 

তবে কি চলেই যেতে হবে?

এই মায়াভূমি অনাথে সঁপে,

গোধূলির গুরুত্বহীন বাঁকে?

অধরা শরাবদানে ছেড়ে যাওয়া

সাকির বিষাদের মতো,

মুছে দিয়ে যাবতীয় চিহ্ন সমুদয়?

অথচ স্পর্শেরা পরিত্রাণকামী নয়।

এখনও প্রলয়তুচ্ছ অপেক্ষা ঘনায় এ হৃদে,

সদ্য কিশোরীর প্রথম মনখারাপের অসুখ,

কথা নেই বহুদিন,চোখে চোখ সুদূর অতীত।

 

আসছো না বলে প্লাবন বন্ধক পড়ে আছে,

চিতাসম্ভব সূর্যে পুড়ছে চক্রবৃদ্ধি ঋণ।


 

 


Saturday, November 6, 2021

ফাত্রাতুন


 
ফাত্রাতুন



"শিবে রুষ্টে গুরুস্ত্রাতা গুরুরুষ্টে ন কশ্চন:
ইতি কঙ্কালমালিনীতন্ত্রে..."

শেষটুকু উচ্চারণের আগেই প্রায় বিবর্ণ পাতা প্রথমে ঝাপসা আর তারপর- 'তুমি তো নারী, তোমার কবিতায় জলের অধিক কিছু থাকার ছিলোনা'। কে রুষ্ট হলো তার? জন্মইস্তক শিবপূজা করে আসছে প্রায় ভগ্ন, অশ্বত্থঘেরা দেউলঘাটে শ্রী, যে পুণ্যভূমি হালিশহরের গঙ্গাজলমৃত্তিকার ঘ্রাণের মধ্যে মিশে থাকেন মহাসাধকের বেড়া বাঁধার সঙ্গিনী লীলাবতী মহাকালী। লোকে বলে তারই অর্জন চট্টোপাধ্যায় বংশে তার বিবাহ, তিন পুত্রের সর্বকনিষ্ঠটির বধূ হলেও তারই হাতে দেড় শতাধিক বৎসর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত পঞ্চলিঙ্গের (বাণেশ্বর, চন্দ্রমৌলীশ্বর, রত্নেশ্বর, রামেশ্বর, অর্ধনারীশ্বর) নিত্যপূজার দায়িত্ব কমলিনী মারফত এসে পড়া। সেই রাতেও কি আরিদ্রা নক্ষত্র হেসেছিলো? জানা নেই। এই প্রাপ্তির লৌকিক ব্যাখ্যা চন্দ্রস্রোতে ভেসে যায় তার গুরুসম্বন্ধীয় অলৌকিক সৌভাগ্যে। সপ্তমবর্ষীয়া কন্যাটি দীক্ষা পেয়েছিলো স্বয়ং শ্রী সারদা মায়ের সাক্ষাত গৃহীশিষ্য শ্রী লাবণ্যকুমার চক্রবর্তীর থেকে। পরমহংসের নশ্বরতা বিষয়ে যারা চর্চা করে থাকেন তাদের কাছে পরিচিত "যুগজ্যোতি" ও "ঠাকুরের বাউল" সহ বহু গ্রন্থের রচয়িতা, প্রেমেশ মহারাজের প্রিয়তম কবি এই সাধকের নাম। শৈবলিনীও বিস্মিত ছিলেন বরাবর এত কিছুর পরেও শ্রীয়ের অন্তর্মুখীনতায়, অধ্যাত্মের পারদভারকে স্ফটিকের স্বচ্ছে নীরব জ্বালিয়ে রাখার দক্ষতায়। সন্তানকে পার্থিব প্রাপ্তিতে সন্তৃপ্ত দেখে সন্তুষ্ট হওয়ার সাধারণ মা তিনি ছিলেন না। ফলত, যোগীচক্ষুর বিচলনের প্রয়োজন পড়েনি। নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন মেয়ে তার শান্তিসূত্রের সমীকরণ নিজেই এঁকে নিচ্ছে বলে। নীলাদ্রীকে দেখে তার নিয়তিতে বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল- "বারাণস্যাং তু বিশ্বেশম ত্র্যম্বকং গৌতমীতটে" । তিনি মেনকা ছিলেন না কিন্তু একথাও তো সত্য পার্বতী শুধুমাত্র কিছু পুরাণমতের নাম। শক্তি ও তার আধার প্রসঙ্গে পুঁথি মানা হলে শেক্সপিয়র কেন নয়? "What's in a name?" 


সেই শ্রী আজ অন্তর্দ্বন্দ্বে বিক্ষত। কোনো অসতর্ক মুহূর্তে কি বাণলিঙ্গ আঘাত পেয়েছেন? সদাশিবের অত্যন্ত উগ্ররূপ এই উপবৃত্তাকার স্বয়ম্ভু লিঙ্গ। রুদ্রজ ব্রাহ্মণেরাও অতি সন্তর্পণে তাঁকে আরাধনা করে থাকেন। কিন্তু তবুও তো শ্রীয়ের গুরুদাদু আছেন। সে জানে শ্রীশ্রীমা নহবতখানায় থাকাকালীন একদিন তাঁর স্বপ্নধ্যানে পিঙ্গলজটা দুলিয়ে বাঘছাল পরা এক শুভ্রকায় শিশু দৌড়াতে দৌড়াতে এসে নালিশ জানিয়েছিলো- "আমায় ফেলে দিয়েছে"। মা তাকে কোলে বসিয়ে আদর করে বুঝিয়ে শান্ত করেছিলেন এই বলে যে "ইচ্ছে করে তো করেনি বাবা, সবই তো তোমার সন্তান, অপরাধ নিতে নেই"। তাহলে? কীসের অপরাধে তাহলে এই শূন্য বাড়িতে অধিকতর শূন্যতা ধারণ করে তার তাকিয়ে থাকা? আজ ষোলোদিন পেরিয়ে গেলো নীলাদ্রি নার্সিংহোমে। স্বধা রোজ ছয় ঘন্টার জন্য বাড়ি ফেরে। মেয়ের মুখ দেখে সে কোনো প্রশ্ন না রেখেই বুঝে যায় অমাবস্যার দেরী নেই। তাহলে কি... তাহলে কি... সে নিজেই হোতা, অধ্বর্যু ও উদ্গাতা এই আকস্মিক 'যজ' ধাতু ', 'ঞ' প্রত্যয়ের অবশ্যম্ভাবী আবির্ভাবের? আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে যে সূক্ষ্ম চিড় ধীরে মহাখাত হয়ে আলাদা দুটি সভ্যতায় পরিণত করলো তাকে ও নীলাদ্রীকে, সে কি জেন হ্যারিসনের তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠা দিলো তবে?

"Collectivity and emotional tension, two elements that tend to turn the simple reaction into a rite"

শীতল লাভার মতো তার অভিমানসমূহ এভাবে বধযোগ্যতা দিলো নীলাদ্রীকে? 



চন্দ্রগর্ভের ক্ষতগুলিকে কলঙ্ক নামে রোম্যান্টিসাইজ করাই প্রথা। সেইহেতু এই প্রশ্ন কখনো ওঠেনা যে শুধুমাত্র শ্রেষ্ঠ সুন্দরী তথা পাণ্ডবশক্তির কেন্দ্রস্থল বলেই দ্যূতসভায় রজস্বলা পাঞ্চালীকে বিবস্ত্র করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিলো নাকি কেশবসখী হওয়ার দায়ে তাঁর জন্মলগ্ন থেকে বিবাহ- প্রতি পলেই কুরুক্ষেত্র? শুধু কৃষ্ণা তো নন, অজস্র উদাহরণ রয়েছে যেখানে ঈশ্বরনির্ভরতাই কারণ জীবনব্যাপী দুর্ভাগ্যের। "দুঃখ তাঁর দয়ার দান" উচ্চারণকারী গান্ধারী কি বাসুদেবকে অভিসম্পাত দানে বিরত থাকতে পেরেছিলেন শেষতক? শ্রী তার জীবনের প্রেক্ষিতে এই সূত্রের বহু সম্ভাব্যতা খোঁজার চেষ্টা করেছে এতো বছর ধরে। সে শৈবলিনীর মতো বৈরাগ্যপ্রতিমা নয়, কমলিনীর মতো সিংহতেজাও না। এই দুইজন ব্যক্তিগত আদর্শকে যাপনে পরিণত করতে পেরেছিলেন কারণ ভাগ্য তাঁদের যে মুক্তি দিয়েছিলো তাতে তারা মেধা ও কাঠিন্য মিশিয়ে নিস্তেল স্বাধীনতার অণ্বেষণে নিজেদের ব্যস্ত করে তুলেছিলেন। অথচ শ্রী? অধ্যাত্মের তীব্র ফল্গু তার মধ্যে প্রবহমান জেনেও তার মা তাকে পাত্রস্থ করেছিলেন অতিরিক্ত দ্রুততায়। যতই শৈবলিনী দাবী করুন নীলাদ্রি সাধারণ পুরুষ নন কিন্তু একমাত্র নিজস্ব মায়াবিশ্বাস ছাড়া এ প্রমাণ তিনি কোথায় দিয়েছিলেন শ্রীকে যে তার জন্য নির্বাচিত জন শর্ব? শ্রী যা পেয়েছে তাতে যদি নীলাদ্রি অনঘও হন তবুও তার রূপ মণিকর্ণিকায় শবের কানে তারকব্রহ্ম নামদায়ী কামারী, কৈলাসে উমার পুরুষ সোম নন। রাগ-রাগিণী সামপ্রিয় নীলাদ্রীর দুর্বলতা অথচ কখনো শ্রীকে শুনতে চাইলেন না তো তিনি। প্রাইমারি থেকে উচ্চবিদ্যালয়- যে শ্রীয়ের দিকে তাকিয়ে হেন প্রাণী নেই অবাক হতোনা গন্ধর্বসম আলোয়, কখনো তাকেই দেখার সময় নীলাদ্রীর চোখে তো মুগ্ধতার অঞ্জন লাগলোনা। কেন? অথচ নীতিজ্ঞান ও চরিত্রে নীলাদ্রীতুল্য পুরুষ দুর্লভ। এক্ষেত্রে তিনি অবিসংবাদী অজাতশত্রু। তাহলে কি অতিশৈশব থেকে ঈশ্বরবোধের যে বেদী নির্মাণ করেছিলেন শৈবলিনী তাইই শ্রীয়ের বোধ ছাপিয়ে শরীরী উপত্যকাকে দেবজ অংশ করে তুলেছিলো যাকে ঘিরে মন্ত্রোচ্চারণ করা যায় কিন্তু অন্তরঙ্গে আনার স্পর্ধা দেখানো যায়না? অগ্নিকে আলিঙ্গন কেই ই বা করেছে কোনদিন? তাহলে কি যে অনীশ্বরকে ভিত্তি করে কমলিনী ও শৈবলিনী সাম্রাজ্যজয়সুলভ সুখলাভ করেছিলেন সেইই শ্রী ও নীলাদ্রীর মধ্যবর্তী আলোকবর্ষ ব্যবধানের মূল রহস্য? 


স্বধা পৃথিবীতে আসার আগে ও পরে, মাত্র একবার, প্রথম ও শেষবারের মতো নীলাদ্রীকে আঘাত করতে চেয়েছিলো শ্রী, যদি রূপকথার মতো গুহামুখ থেকে পাথর সরে গিয়ে জন্ম নেয় নদী না হোক অন্তত কোনো সিল্করুট। সে তখন দ্বিতীয়বারের জন্য সন্তানসম্ভবা। ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ তখনো নিষিদ্ধ না হওয়ায় কে আসবে সে জানত। 

-- "পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা"
যাক, তোমাকে অন্তত এই যুক্তিতে বিয়েতে রাজি করানো গেছিল"

মুহূর্ত কয়েকমাত্র। উত্তর এসেছিল...


-- "নির্বাচন করো শ্রী। আমি তোমায় চব্বিশ ঘন্টা দিলাম। তুমি এই সন্তানকে জন্ম দেবে কিনা, দিলে আমায় সারাজীবনের জন্য হারাবে। যদিও আমি আমার জীবদ্দশায় তোমার কোনো দায়িত্ব কর্তব্যেই ত্রুটি রাখবো না সে তুমি যে সিদ্ধান্তই নাও। স্বামী কিনা, প্রেমিক তো নই"


পরবর্তী ইতিহাস কোনো পাঁচালী নয়। গর্ভস্থ পুত্রটি হত্যা হয়েছিলো। আর ঠিক সেইদিন থেকে স্বধা দেখেছিলো কীভাবে একই রাতের আকাশের নিচে একই যুদ্ধক্ষেত্রে অন্ধ নৈশব্দ্য নিয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে দুই শত্রুশিবির, পরের কোনো সূর্যই যেখানে এমন আসেনা যখন শঙ্খনাদে রণ ঘোষিত হবে। শুধু অস্ত্রেরা নিপুণ থেকে নিপুণতর হতে থাকে, কৌশলেরা নিখুঁত থেকে নিখুঁততর, লক্ষ্যরা তীক্ষ্ থেকে তীক্ষ্তর আর দূরত্ব... অনতিক্রম্য।



স্বধা শুধু ভেবে চলে মাধবের 'শত্রু' সম্বন্ধীয় শ্লোকটি। কী প্রবল পারস্পরিক সংবেদী হলে দুইটি অস্তিত্ব এইভাবে নিজেদের উন্মাদ ক্ষয়কে শক্তিস্তম্ভে প্রতিস্থাপিত করতে পারে? সমর্পণ নয় অথচ প্রত্যাহারও নৈব নৈব চ। যদি এ প্রেম না হয় তাহলে আজ অবধি পৃথিবীতে একটিও কবিতা লেখা হয়নি। 





Sunday, October 31, 2021

সোনালী চক্রবর্তী


 

ইলুশিও

 

ইলুশিও



তুমি দেখো অকালমৃত্যু, আমি জানি বিচ্ছেদের আতঙ্ক কতদূর তীব্র হলে প্রেমিকের করতলে হত্যারেখা জাগ্রত হয়- আমাদের এক

অদ্ভুত সংস্কার, যে কোনো শব্দের বহুমুখীনতাকে আমরা জেদে অস্বীকার করি অথবা যে উপেক্ষার প্রয়োজন ছিলো বন্দিত্ব আরোপের প্রক্রিয়ায়, তা বরাদ্দ হয় ঝাঁকের কৈ হতে গিয়ে, লালন ভাসেন লালনের জলে, আবাদহীন জমি পড়ে থাকে রামপ্রসাদী খরায়। কমলিনী নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন বহুক্ষণ ধরে (এই ইথারে কাউকে স্মরণ না করা অব্দি সে এসে অনধিকার চর্চা করে না) । যদি শরীরে প্রাণের অভাবের পরিভাষা 'মৃত্যু' হয় তবে হৃদে নয় কেন? কালরেখা প্রতিটি আয়ুতে ভিন্ন হলে অকালের সংজ্ঞা কী? যদি আত্মরক্ষার্থে হত্যা আইনসিদ্ধ হতে পারে তাহলে আজও ইউথেনেশিয়া অস্বীকৃত কেন? এত প্রশ্নের ক্ষত যে উদ্ধারণ পালার বিবেক পলাতক। আজ দেখতে যাবেন স্বধাকে, এই স্ফুরণে এখন লেডি ম্যাকবেথও যদি তার সঙ্গে কফিতে আসে, খুব ক্ষতি? কার ক্ষতি?


"মরলে ভাই? বেশ... এ রাসের ঘোর ভাঙাবো না আজ, ভাঙবেও না"


কমলিনীর তো সুখের কথা হবেই, স্বধার গ্রীবায় অভ্রান্ত স্কারলেট, চলনে গর্ভিণী কাছিম। তাকে সমাজ যারপরনাই ভৎর্সনা তো করতোই নাগালে পেলে এই মুহূর্তে রাবাবের যে তারে তার আঙ্গুল ছুঁয়ে আছে পাপ সাব্যস্তে, কিন্তু তিনি তো কমলিনী, একশো আট তার সংস্কারে। তার মানসী আজ এমন আশ্লেষে যা পেতে প্রতিটি অবতার শরীরে, ঔরস-যোনির চক্রে, কোটি কোটি জন্ম ধরে মাথা ঠোকে শ্রী ভগবান।


নাড়িতে যে নৌকা ছিঁড়ে ভঙ্গুর পদ্ম কিছু রসস্থ থেকে গেলো, ঘাতক রাজহাঁস সে ঘুণ বিস্মৃত হলো না- তত্ত্বগত অভিজ্ঞান আর প্রকৃত উপলব্ধিতে যে ফারাক তাকে আসমান জমিন বলে নিতান্তই লঘু করে ফেলা হয়, আসলেই তারা দুই মেরুর। প্রতিলিপি বা ছবি কল্পনায় অরোরা বেরিয়ালিস ভাবাতে পারে কিন্তু তা বিশ্বরূপের বিদ্যুত সঞ্চালনে ব্যর্থ। অদ্ভুত ঘোরের ভিতর ঘাড় গুঁজে ভাবছিলো স্বধা। তাকে শীতল রক্তের সরীসৃপ বলে ব্যঙ্গ শুনতে হয় বিস্তর, একেবারেই তাপ সহ্য করতে পারে না বলে অথচ গত কয়েক ঘন্টা সে প্রায় ফার্নেসের ভিতর ছিলো বলা যায়। অব্যবহার্য-পরিত্যক্ত জিনিস বোঝাই একটা ঘর যাকে গুদাম বললে বিন্দুমাত্র নামকরণ বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা থাকবে না। স্বেদবিন্দুর স্রোত ছাড়া চন্দন পালঙ্কের থেকে ব্যবধান বোঝেনি তো অথচ এই প্রলয়, প্রবল প্রার্থিত হলেও তার প্রস্তুতি ছিলো না কোনো, পরবর্তী ধারণাও, ঠিক এইখান থেকেই তার বিস্ময়যাত্রা। 


কোথাও একবারের জন্যেও স্বধার দ্বন্দ্ব আসেনি এতোদিন শৈবলিনী-কমলিনীর আধ্যাত্মিকতা আর ট্যাঙ্গো সালসার উন্মাদ আবেগের মধ্যে। দুইই ছান্দ্যোগ্য, দুইই এক সত্যের কথা বলে, শকট ভিন্ন, পথ এক। প্রথমটি মূলাধার-স্বাধিষ্ঠান-নাভি-হৃদ-বিশুদ্ধ-আজ্ঞা-সহস্রারকে জাগ্রত করে সূক্ষ্মতায় বিলীনে বিশ্বাসী। দ্বিতীয়টি নির্মেদ আধারকে ভেঙেচুরে মিলন ও মুক্তি বিন্যাসে শরীরকেই অতিক্রম করে চলে। কোথায় বিরোধ? বাউলাঙ্গে রজ-রক্তও তো সেই দিকই নির্দেশ করে। সবই 'ইত্থুসে ব্রহ্ম'। এই মতবাদ স্বধার স্নায়ুতে বিশ্বস্ত আশ্রয়ে ছিলো ফলত সে শরীরকে কোনোদিন অস্বীকারের চেষ্টামাত্র করেনি, অবদমন এক আত্মঘাত মাত্র জেনে অপেক্ষা করেছে। অথচ তবুও আজ মনে হলো সে কিছুই জানতো না এতদিন, একে চন্দ্র থেকে চন্দ্রবিন্দু, কিছুই নয়।


শ্বেতপাথরকে জড়িয়ে থাকো আগুনের সাপ, দেখো নাভি থেকে কিছু ব্যথা ফ্লেমিংগো হয়ে উড়ে যাচ্ছে শেষ সন্তের খোঁজে- নিশ্ছিদ্র যন্ত্রণা স্বধার সর্বশরীরে। সেই অনুভূতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে যে পশমে মাথা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো কয়েক মুহূর্তের জন্য ইন্টারলিউড শ্রান্তিতে, এই ক্ষণে তার অনুপস্থিতি। দংশন... এতো নিষ্ঠুর হয়? বজ্রের শক্তিতে বেঁধে রাখা উর্দ্ধবাহুদ্বয়ের ভিতর মাথা থাকলে, শ্বাসরোধী চিৎকারটিও কি নিস্তেল প্রাপ্তির? তার অতলে প্রোথিত হচ্ছিলো যার নৃশংস স্তম্ভ, উপসংহারী তন্দ্রায় তাকেই অসহায় পেয়ে এতো আদরের আলপনা কীভাবে আঁকলো সে? শরীরে এভাবে মায়ামেঘ ঘনায়? এইই কি সেই বিশালাক্ষীর থান শৈবলিনী যাকে নির্দেশ করতেন পঞ্চভূতের ফাঁদ নামে? কাঁদছে স্বধা আপাতত... শৈবলিনী দেখছেন কুয়াশার আলোয়... ভাঙছে, নামছে, অঘোর বর্ষা...


যখন শারীরিকভাবে পুরুষ নারীকে চায় অথবা নারী পুরুষকে, সেই আকর্ষণে বহু স্তরবিন্যাস থাকে, শ্রেণীভেদও, কোনোটিই বিচারাধীন নয় কারণ যে কোনো শরীর আসলেই এক আশ্চর্য আলাদিন। জাদু কি প্রদীপে থাকে? সম্ভব? প্রতিটি মানুষের ভিতর বসত করে যে দুর্দম শক্তি সেই তো রূপকে চিরাগ। যে বোঝে সে খোঁজে, যে বিশ্বাস করেনা, পায় না, এতো জলবৎ অঙ্ক মাত্র। শরীর নিয়ে এতো শুচিবায়ুগ্রস্ত যারা, একবারও যে কেন তারা ভাবেনা- "যদৃচ্ছা লাভ"। তেষ্টাকে প্যারামিটার ধরলে আরও সহজ হয় ধারণের আদল। জলের সন্ধানে কেউ পুকুরে অভ্যস্ত, কেউ খোঁজে নদী, যার তৃষ্ণা মেটেনা সে ডোবে, তলিয়ে যেতে যেতে এল ডোরাডো। আর বাকি অংশের কিছুই লাগেনা, বন্ধ বোতল থেকে প্রয়োজন মিটিয়ে নেওয়া, সুতরাং বিচার খাটে না, খাটতে পারে না। অযথা উৎকর্ষ অপকর্ষ ন্যায় অন্যায় নিয়ম নীতির খাপ। 


কিন্তু আজ একথা স্বধা নিশ্চিতভাবেই বলবে যেহেতু শরীরের দূরত্ব শেষ হওয়ার ঠিক পর থেকে টান বিদ্ধংসী হতে শুরু করলো সুতরাং গন্তব্য "দ্যা থার্ড শিপ"। যুক্তি সাজাচ্ছিলো সে সাদা কালো চৌষট্টি খোপে। এখানে ভিজে যাওয়া তালুতে চুমু রাখতে তোলপাড় এসেছে, তুরপুন নখে তৈরী হওয়া আঁচড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে সাধ গেছে, বরাবরের সম্বোধন 'তুই' অতর্কিতে বার কয়েক 'তুমি' হয়ে গেছে। মানুষের ভিতরের মানুষটা বীজতলার পরেই যেন পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। ছিন্নভিন্ন করে চলে যাওয়ার পর বার্তা এসেছে "বুকে আয়, এবার ঘুমো, ঘুমিয়ে পড়, মাথায় হাত দিয়ে রেখেছি"। বারবার প্রশ্নেরা এসেছে "শরীর ঠিক আছে? ঠিক করে কথা বল, শরীর কি ঠিক আছে?" সে উত্তর দেয়নি কারণ এই উৎকণ্ঠায় শরীর যতটুকু থাকে তার থেকে অযুত মাত্রায় বেশী থাকে শরীরের অপ্রাসঙ্গিকতা। 


এখন মণিমালা'কাল। বারিধারা শঙ্খ শরীরের হাঁসুলি বাঁক ছুঁলে অনুপ্রবেশ বোধ হচ্ছে। স্পর্শের স্মৃতি- যারে হেরিলে এ দেহলতা তাবিজ বোধ হয় যেমত। হাওয়ায় বৃন্দাবনী সারং উড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছেন সেই অনন্ত লম্পট। অজস্র ময়ূরের পালক উড়ে বেড়াচ্ছে দিগন্ত বিস্তারে। স্বধার মনে করতে ইচ্ছে করলো তার নাম যিনি লিখেছিলেন "নারী নরকের দ্বার"। তিনি কি কৃষ্ণভক্ত ছিলেন? জানা নেই তার। তিনি সম্ভবত ময়ূরও দেখেননি। স্বধা হেসে উঠল। পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম রাজনীতিবিদটি প্রতারকই তো ছিলেন। ফেরেননি গোকুলে না? কেনই বা ফিরবেন? অথচ নশ্বর শেষ মুহূর্ত তক স্বর্ণমুকুটে শিখিপাখা যে কেন গুঁজে রাখলেন? স্টাইল স্টেটমেন্ট? যেভাবে ক্রাইস্টের ট্যাটুর ভিতর দিয়ে ইদানীং নিপুণ শৈল্পীতে আঁকা থাকে বিলাভেডের নাম, আপাত অদৃশ্য। "বুঝে লহো মন যে জানো সন্ধান"। শ্রীমতির যোনিচিহ্ন আজীবন মস্তকে ধারণ করে মহাভারত সৃষ্টি আর দ্বাপর ধ্বংসের লীলা করে গেলেন যাদবকুলপতি অথচ কেউ টেরটিও পেলো না। স্বধাকে যে নীল নীল দহনে আজ ছেড়ে গেলো সে তবে কে? কেদার মনে পড়ছে তার। ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে উত্থিত ব্যপনে কস্তুরীঘ্রাণ। শুভ্র পাথরে আছাড় খেয়ে ভেঙেচুরে যাচ্ছে অজস্র পিতলের ঘন্টাধ্বনি। কৃষ্ণসর্পটি কাকে আঁকড়ে আজ প্রস্তরীভূত হলো?


আঞ্জুমান-২

 


আঞ্জুমান ২

"সাংকাশ্য নগরীর এখন কী নাম আর্নেস্তো?"

-- "প্রবারণার তো এখনো অনেক দেরী তথাগত, আজ হঠাৎ ?"

" 'বহুজন হিতায় বহুজন সুখায়' যদি শ্রমণদের কোনো একদিন বলে এসে থাকি 'চরত্থ্বে ভিক্ষবে চারিকং', নিজে আজ তার ব্যতিক্রম হবো? নিজেই না বললে খানিক আগে আদর্শকে হত্যা করেছে আমার আর তোমার শরীরকে? তোমায় প্রত্যক্ষ করতে হবে না তোমার আদর্শের পরিণতি? অন্ততঃ আমি মহাপরিনির্বাণ নিয়েছিলাম ব্যক্তিগত নির্ধারণে আর তা প্রথম বৌদ্ধ সঙ্গীতির আগেই। কিন্তু আর্নেস্তো, তুমি তো আজও সমাজতন্ত্র নিয়ে কিছু ভ্রমে। সব পেরিয়ে তোমায় আমি কবিই তো দেখি। আর কোন উন্মাদ বিপ্লব আনতে এমন প্রেমিক হতে পারে? চাই না আঁশটুকুও থাকুক, তাই আজই। তাকাও... স্বধাকে দেখতে পাচ্ছ?"

-- " পাচ্ছি। ভূতগ্রস্তের মতো ভাঙা ঘুম হাতে করে বসে আছে। প্রথমটা কিছু বোঝেনি। ধীরে আতঙ্ক তার ডানার মধ্যে মুড়ে নিচ্ছে, সংজ্ঞা মুচড়ে উঠছে "

মহকুমা মফস্বলটি যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে এবং পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু ভারতরাষ্ট্রে, সুতরাং কিছুমাত্র বিস্ময়ের নয় তার সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী অক্সিজেন প্ল্যান্টটির দূরত্ব চুরাশি পূর্ণ আট কিলোমিটার। একটি মাত্র জাতীয় সড়ক (এন এইচ চৌত্রিশ, বর্তমানে বারো) যা দিয়ে দুটি অঞ্চল যুক্ত, সেটিই উত্তরবঙ্গে পৌঁছানোরও একমাত্র স্থলমাধ্যম প্রায়শই অতি বর্ষায় যার অন্তর্গত কিছু ব্রীজ ভেসে ও ভেঙে যায় এবং জলস্রোতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাকি ভূ-খণ্ড থেকে। বর্ষা ব্যতীত তাকে ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়া প্রতিদিনের কোটি খানেক যান কল্পনা করে মেঠো পথের গোরুর গাড়ি তাদের তুলনায় কতটা সৌভাগ্য পোষণ করে আর অবশ্যই প্রার্থনায় থাকে কবে পুরোপুরি এই স্থলজ অসভ্যতা থেকে নদীমাতৃক সভ্যতায় ফিরে যাওয়া যেতে পারে। এ নরক থেকে ত্রাণ দেবে এমন পুত্রাণের আশা "দেহি দেবী" মন্ত্রেও উচ্চারণ করা পাপ, এমত স্বধারও বিশ্বাস। ট্র‌্যাফিক আইন যারা রক্ষণাবেক্ষন করেন তারা জানাতে ত্রুটি রাখেন না ইমার্জেন্সি সার্ভিসগুলির জন্য সড়কে সর্বদাই অগ্রাধিকার থাকবে যেমন এম্বুলেন্স, বেবিফুড, লাইফ সেভিং ড্রাগস ইত্যাদি কিন্তু এই আইনের নির্দেশিকায় যে 'সড়ক' শব্দটির অস্তিত্ব আছে "ইতি গজ"র মতো করে যা সমগ্র আইনটিকেই প্রহসনে পরিণত করেছে তা জানার বা জানানোর কোনো দায় তাদের থাকে না। এ রাজ্যে তুখোড় আন্তর্জাতিকতায় ক্ষমতার পায়ের নিচে লাল কার্পেট পাতা, দামী মৃতদেহের সদগতিতে হাজির গ্রিন করিডোর, দফতরের দেওয়ালদের পরানো থাকে নীল জার্সি... আর যাদের মুখে রক্ত উঠিয়ে রোজগারের অংশ থেকে কেটে নেওয়া ট্যাক্সে এই লাল সবুজ নীল আতসবাজি তাদের জন্য 'পূর্ত দফতর' নিতান্তই ডাইনোসর বা ডোডো পাখি। মাত্র দেড়শ কিলোমিটার দূরের মহানগরীতে পৌঁছতে বা ফিরতে দিনের সিংহভাগ সময়কাল কাটিয়ে দেওয়া স্বধার কাছে জন্মইস্তক এই অভিজ্ঞতা নিত্যকর্ম পদ্ধতির মতোই সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু কিছুক্ষণ আগের ফোন তাকে যে খবর দিলো তাতে সে ফুটন্ত তেল আর জ্যান্ত আগুনের মধ্যের পার্থক্য স্পষ্ট বুঝতে পারল। রিফিলড অক্সিজেন সিলিন্ডারের যে ট্রাকটি প্রতিদিন সন্ধ্যায় সদরে ঢোকে, ডিফারেন্সিয়াল ভেঙে যাওয়ায় আজ কতক্ষণ পর আসবে সংবাদ নেই। নার্সিংহোমের মজুদ থেকে নীলাদ্রি আর মাত্র ঘন্টা দুয়েক সরবরাহ পাবেন তার ক্যনুলায়, বাকিটা ঈশ্বর।

" কিন্তু তথাগত, আপনি এই পরিস্থিতি দেখিয়ে আমায় কী বোঝাতে চাইছেন? আমার আদর্শ এখানে আঘাত পাচ্ছে কোথায়? "

-- " বড় অধৈর্য হয়ে পড়ো তুমি আর্নেস্তো, বালক স্বভাব। যা দেখাতে চাইছি তা আমায় প্রশ্ন করে জানতে হবে না। প্রসববেদনা উঠলে কি ধাইমাকে জাগিয়ে তুলতে হয় আসন্নপ্রসবাকে? "

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ আছে যেমন প্রতিটি ক্রীড়ার নিজস্ব অনুশাসন, প্রতিটি সমাজের নিজস্ব বিধান আর প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব ব্যবধান। সোশ্যাল মিডিয়া কোনো ব্যতিক্রম কি? যারা এটিকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান বলে স্বীকার করে নেয় তারা মানবে এরও নিজস্ব ব্যাকরণ, অনুশাসন, বিধান, ব্যবধান সবই বর্তমান। নিজস্ব গণ্ডিতে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিকে তাহলে কেন প্রকাশ করা যাবে না নির্দ্বিধায়? অন্ততঃ স্বধা এমনই জানত। সে যেমন নীলাদ্রির নার্সিংহোমে এডমিটের খবর জানিয়েছিলো ঠিক তেমনভাবেই তার সঙ্কটও। একটি সিলিন্ডারের অভাবে যে তার বাবা তার চোখের সামনে ডাঙায় তোলা মাছ হয়ে যাবে এই সাদা ও সরল সত্যকে সে ভিক্ষার আবেদনে পোস্ট করেছিলো স্নায়ু সামান্য নিয়ন্ত্রণে আসতেই।

স্বধার প্রত্যাশা ব্যর্থ হয়নি। তার অতি সংক্ষিপ্ত বৃত্তও প্রায় হাজার দুয়েক শেয়ারে তার আবেদন পৌঁছে দিয়েছিলো সেলেব, সাহিত্যিক প্রশাসক মহলে। প্রত্যেকেই পূর্ণোদ্যমে তাকে সাহায্যের চেষ্টা করেছিলেন। ফল এসেছিলো মন্ত্রবৎ। আধ ঘন্টার মধ্যে সায়রের ফোন তাকে জানিয়েছিলো প্রশাসন সহ বিভিন্ন মহল থেকে ইডেনের কেবিন ওয়ানকে নিয়ে এত উৎকণ্ঠার কৈফিয়ত তাকে দিতে হচ্ছে যে সে সমস্যায় পড়ছে। সায়রের মালিকানার অন্য নার্সিংহোমগুলিতে ক্যারিয়ার পাঠিয়ে সিলিন্ডার আনানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বধাকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে ভবিষ্যতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সে কোনো সাহায্য চাইবে না, এর বিনিময়ে সায়র ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ থাকলেন নীলাদ্রিকে পরিষেবা সংক্রান্ত কোনো অভাবে না পড়তে দেওয়ার। অতি সহজ চুক্তি। একপক্ষে নীলাদ্রির আয়ু, বিপরীতে ইডেনের নিরাপত্তা। যে পরিমাণ আলোড়ন এই মুহূর্তে স্বধার পোস্টকে ঘিরে শুরু হয়েছে, কেন নার্সিংহোমের অধীনে থাকা সত্ত্বেও পেশেন্ট পার্টির ফরেন হেল্প লাগবে এই ইস্যু তুলে, তাতে ইডেন ঘোরতর বিপদে। চরম স্বার্থপর স্বধা, নীলাদ্রির মুখ স্মরণ করে চোখ বুজে কথা দিয়েছিলো- ভবিষ্যতে ইডেনে তার চোখে যাইই পড়ুক, যাইই ঘটুক যে কারোর সঙ্গে, একমাত্র নীলাদ্রির প্রসঙ্গ ব্যতীত সে প্রত্যেককে এবং সবাইকেই অগ্রাহ্য করবে-  "মাস্টারমশাই, আপনি কিছু দেখেন নি"। কতো যে ডিল হয় প্রতিটি পলে এই সংসারে, কতো শতরঞ্জ... তবুও দ্যূতক্রীড়ার প্রসঙ্গ উঠলেই গান্ধার যুবরাজকে স্মরণ করে ইতিহাস... এ বড়ো দুর্ভাগ্যের।

"আর্নেস্তো, যেটুকু দেখলে তা এক রোপণ উপাখ্যান মাত্র। সব বীজের নিয়তিতে মহিরুহ থাকে না, কিছু বিষজ হাহাকারও ধারণ করে। পোখরান মনে পড়ে? আমি হাসছিলাম তাই না? ভারতরাষ্ট্র তার কূটনৈতিক তুরুপে পৃথিবীর ষষ্ঠতম শক্তিশালী হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করলো, তার দায় কার - স্মাইলিং বুদ্ধ - আমারই না? আজও দেখবে। তাকিয়ে থাকো..."

--" তাকিয়েই তো আছি তথাগত কিন্তু এখানে কী করে আমার ভ্রম ভাঙার কাঠামো গড়া হবে সে চালচিত্র এখনো অব্দি পেলাম না। আমি অনুমান করছিলাম আপনি মৌলবাদ কীভাবে মহামারী হয়ে উঠছে এই অতিমারি পীড়িত উপমহাদেশেও সেই নিয়ে কিছু বলবেন। আচ্ছা খেয়াল করেছেন, জাত নির্বিশেষে মৌলবাদীদের নিজেদের মধ্যে কী প্রগাঢ় মিল? অন্ধত্ব ভিন্ন এদের দ্বিতীয় ধর্ম থাকে না, পৈশাচিকতা ভিন্ন দ্বিতীয় ধর্মাচরণও নয় অথচ এদের চামড়ার নাম 'ধার্মিক'। কী পরিহাস না? আমি এও ধারণা করছিলাম তথাগত আপনি মার্কস নিয়ে হয়তো বলবেন। "রিলিজিয়ন ইজ দ্যা ওপিয়াম অব দ্যা পিপল"- এই বিকৃত, খণ্ডিত কোটেশনের মূল ও পূর্ণাঙ্গ বাক্যটি তুলে হয়তো স্বচ্ছ করে দেবেন কেন মৃত্যুমুহূর্ত অবধি মার্কসের গলায় ক্রুশের চেনটি ছিল। এও বলবেন পশ্চিমবঙ্গের রক্তাভ জারজেরা জনগণকে এতটাই অশিক্ষিত ভেবেছিলেন যে তারা ধরেই নিয়েছিলেন কেউ মার্কস পড়ে না, বোঝে না, জানে না। ফলে হাতের যাবতীয় মাদুলি ও তাবিজদের যত্ন করে সাদা পাঞ্জাবির হাতায় ঢেকে, তিন দশকেরও বেশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণ অনুষ্ঠানকে অবজ্ঞা করে তখ্ত অধিকারে রেখেছিলেন "

--"যা তুমি নিজেই বোঝো তা যদি নতুন করে তোমাকে দেখাতে যাই তবে যে 'বোধি' শব্দের অর্থ 'নির্বোধ' হয়ে যায় আর্নেস্তো। নীরবতা পৃথিবীর ভয়ংকরতম শীতল মারণাস্ত্রের নাম। কিছুক্ষণ না হয় তারই অনুশীলন করলাম আমরা? এসো... বেশী নয়, বুদ্ধের আত্মার নাম পরিমিতি... নিপ্পন আলো হয়ে ওঠা অবধি, এসো"


"Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people."